Sunday, April 19, 2026

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় চলাচলের ভরসা এখন সাইকেল


ছবিঃ ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিজের গাড়ি চালিয়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা গাজা সিটিতে বাসিন্দাদের পরিবহন করছেন। গাজা সিটি, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬। (সংগৃহীত । আল জাজিরা । দাউদ আবু আলকাস/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

প্রতিদিন সকালে ব্যাগে ল্যাপটপ ভরে সাইকেলে চড়ে বের হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান এল-নাবিহ। লক্ষ্য একটাই—বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ আছে এমন কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া, যাতে অনলাইনে নিজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসনের আগে গাজায় সাইকেলে চড়ে অধ্যাপকের ক্লাস নেওয়ার দৃশ্য ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ, বিধ্বস্ত অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার ধ্বংস সেই বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। জ্বালানির তীব্র সংকট ও গণপরিবহন অচল হয়ে পড়ায় এখন অনেকের কাছেই সাইকেল হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা।

শুজাইয়া এলাকায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এক বিমান হামলায় এল-নাবিহের ব্যক্তিগত গাড়িটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি জানান, গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর আর জ্বালানি না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে সাইকেলের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে গাজার পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষতি কয়েক বিলিয়ন ডলারের বেশি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপত্যকার প্রায় চার-পঞ্চমাংশ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় যান চলাচল একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এক সময় গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা আবু মোহাম্মদ জুনদেইহ এখন বেকার। যুদ্ধের শুরুতেই নিজের গাড়ি হারান তিনি। তাঁর ভাষায়, “এখন গাড়ি কেনা তো দূরের কথা, সাধারণ চলাচলই বিলাসিতা হয়ে গেছে। ভাড়া বেশি, জ্বালানি নেই, আর হাতে থাকা টাকাও অনেক সময় গ্রহণ করতে চায় না চালকেরা।”

ধ্বংসস্তূপে ভরা সড়ক, বিকল্প পথের অভাব এবং হামলার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে গাজায় চলাফেরা এখন বিপজ্জনক ও কষ্টসাধ্য। এমনকি সীমান্ত আংশিক খুলে যাওয়ার পর যাঁদের চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি মিলছে, তাঁদের অনেককেই হেঁটেই যাত্রা করতে হচ্ছে।

চাহিদা বাড়লেও গাজায় নতুন সাইকেল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। গাজা সিটির জাল্লা সড়কে একটি ছোট সাইকেল মেরামতের দোকান চালান আবু লুয়াই হানিয়েহ। তাঁর দোকানে সারি সারি ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ, কিন্তু নতুন সাইকেল নেই।

তিনি জানান, যুদ্ধের আগে যেখানে ২০০ ডলারের কম দামে সাইকেল পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম ছাড়িয়েছে এক হাজার ডলার। অধিকাংশ মানুষের পক্ষে তা কেনা সম্ভব নয়।

যুদ্ধের বাস্তবতায় সাইকেল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, অনেকের জীবিকার উৎসও হয়ে উঠেছে। গাজা সিটিতে একটি ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান এখন পুরোপুরি সাইকেলনির্ভর। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আবু নাসের আল-ইয়াজজি বলেন, জ্বালানি সংকট ও যানবাহন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা সাইকেল ব্যবহার শুরু করেন।

তাঁদের বহু কর্মী যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, তবে বেকারত্ব বাড়ায় নতুন কর্মীর সংখ্যাও বেড়েছে। ডেলিভারি কর্মীরা সাইকেলের সঙ্গে প্লাস্টিকের ঝুড়ি লাগিয়ে খাবার, কাপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন।

২৩ বছর বয়সী আহমাদ যুদ্ধের আগে আইন পড়তেন। এখন তিনি সাইকেলে করে ডেলিভারি করেন। তাঁর মতে, “শুরুতে খুব কষ্ট হতো। কিন্তু এখন মনে হয়, সাইকেল না থাকলে আমি চলতেই পারতাম না।”

তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দেয় এই সাইকেল। এখন সেটাই তাঁর একমাত্র আয় ও চলাচলের মাধ্যম।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন