- ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
ভারতে কার্যরত বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রাইভেট ইক্যুইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এক রায়ে কর সংক্রান্ত বিরোধে সরকারের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৫ জানুয়ারি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায় দেন, মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান টাইগার গ্লোবালকে ২০১৮ সালে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ফ্লিপকার্টে তাদের শেয়ার বিক্রির লাভের ওপর ভারতে কর দিতে হবে। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালে দিল্লি হাইকোর্টের দেওয়া আগের একটি রায় বাতিল করা হয়, যেখানে ভারত–মরিশাস কর চুক্তির আওতায় কর ছাড়ের সুযোগ পেয়েছিল টাইগার গ্লোবাল।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে কর চুক্তির ব্যাখ্যায় আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, কেবল কর-নিবাস সনদ থাকলেই চুক্তির সুবিধা পাওয়া যাবে—এমন নয়। যদি কোনো অফশোর বিনিয়োগ কাঠামোকে কাগুজে বা বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন বলে মনে হয়, তাহলে কর ছাড় প্রত্যাখ্যান করা যাবে। এতে ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার বা শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে কর ঝুঁকি বেড়ে গেল বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় সরকারের কর কর্তৃপক্ষকে অতীতের অনেক লেনদেন খতিয়ে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন, তাঁদের বহু ক্লায়েন্ট আশঙ্কা করছেন—যেসব লেনদেন তারা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে বলে মনে করতেন, সেগুলো আবার তদন্তের মুখে পড়তে পারে।
টাইগার গ্লোবালের মামলাটি শুরু হয় ২০১৮ সালে, যখন মার্কিন খুচরা বিক্রেতা ওয়ালমার্ট ফ্লিপকার্ট অধিগ্রহণ করে। তখন টাইগার গ্লোবাল মরিশাসভিত্তিক তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের প্রায় ১৭ শতাংশ শেয়ার প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল, তাদের বিনিয়োগ ২০১৭ সালের আগের হওয়ায় কর ছাড় প্রযোজ্য। তবে ভারতীয় কর কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, ওই মরিশাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছাড়াই কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত কর কর্তৃপক্ষের পক্ষেই রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, দেশের ভেতরে সৃষ্ট আয়ের ওপর কর আরোপ করা রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার, এবং তা খর্ব করা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি।
এই রায়ের প্রভাব শুধু টাইগার গ্লোবালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মরিশাসসহ বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে করা বহু পুরোনো বিনিয়োগ এখন নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যদিও ভারত ও মরিশাস ২০২৪ সালে কর চুক্তি সংশোধনের প্রোটোকলে সম্মত হয়েছে, সেটি ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণে কর ছাড়সহ নানা সুবিধা দিয়ে আসছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত শুধু মরিশাস থেকেই ভারতে প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। তবে কর ফাঁকি ও অফশোর কাঠামোর অপব্যবহার নিয়ে বিতর্কও দীর্ঘদিনের।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সাম্প্রতিক এই রায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে এমন অনিশ্চয়তা ভারতের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।