Wednesday, February 4, 2026

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন: প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন শেখ হাসিনা


ছবি: স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মুখে হেলিকপ্টারে করে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। [সংগৃহীতঃ বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়/এএফপি/গেটি ইমেজেস]

আন্তরজাতিক ডেস্ক । PNN 

বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এখন ভারতের কলকাতায় নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। দেশের আদালতে তারা ‘অপরাধী’ ও ‘পলাতক’ হিসেবে বিবেচিত হলেও কলকাতার শপিং মলের ভিড়ভাট্টা ফুডকোর্টে বসে কফি আর ফাস্টফুডের আড্ডায় তারা আলোচনা করছেন রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কৌশল।

প্রায় দেড় বছর আগে টানা গণবিক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই সময় বিক্ষুব্ধ জনতার অগ্রযাত্রার মুখে হেলিকপ্টারে করে তিনি ভারতে পালিয়ে যান।

তার পতনের পরপরই আওয়ামী লীগের হাজারো নেতাকর্মী দেশ ছাড়েন। সহিংসতা ও একের পর এক মামলার মুখে অন্তত ৬০০ নেতাকর্মী আশ্রয় নেন ভারতের সীমান্তবর্তী শহর **কলকাতা**য়। সেখান থেকেই দলীয় যোগাযোগ ও সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনচাপের মুখে আওয়ামী লীগ–এর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। হত্যা, দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হয়। ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ ও প্রচারণা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এদিকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের শেষ দিকে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তবে তিনি এ রায়কে ‘মিথ্যা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বর্তমানে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির একটি গোপন ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। দলীয় সূত্র জানায়, প্রতিদিন ১৫–১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত তিনি ভার্চুয়াল বৈঠক ও ফোনালাপে যুক্ত থাকছেন। কলকাতায় অবস্থানরত সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়মিত দিল্লিতে ডেকে নেওয়া হচ্ছে দলীয় কৌশল নির্ধারণের জন্য।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার তাকে ফেরত চাইলেও ভারত এখন পর্যন্ত প্রত্যর্পণ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং তার রাজনৈতিক তৎপরতা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নীরব পর্যবেক্ষণের মধ্যেই চলছে বলে অভিযোগ ঢাকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন, আসন্ন নির্বাচন হবে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু। তবে আওয়ামী লীগের বক্তব্য, প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তার গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

দলটির নেতারা নির্বাচনী কার্যক্রম বর্জনের আহ্বান জানিয়ে কর্মীদের ভোট ও প্রচার থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বর্তমান সরকার প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে রাজনৈতিক মামলা ও দমননীতি চালাচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরেই শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণমাধ্যম দমন ও নির্বাচন ব্যবস্থার অবক্ষয়ের অভিযোগ তুলে আসছে। সরকার পতনের পর বহু গোপন বন্দিশালার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে।

অন্যদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সাংবাদিক দমন, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগের মুখে রয়েছে। শেখ হাসিনাকে দণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মানার সমালোচনা উঠেছে।

কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই দাবি করছেন, দেশে ফিরলে তাদের প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। তবু তারা বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার পাল্টাবে এবং জনগণ তাদের দিকেই ফিরবে।

এক সাবেক সংসদ সদস্য স্বীকার করেছেন, দলটির শাসনামলে কর্তৃত্ববাদ ও নির্বাচনী অনিয়ম ছিল। তবে তার মতে, বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে না। “আজ অন্ধকার, কিন্তু এটা চিরদিন থাকবে না,”—বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই নির্বাসিত নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল ও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন