- ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
মহাকাশ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ, পরিবহন ও গণমাধ্যম—এত ভিন্ন খাত একসঙ্গে থাকলে একসময় নাম আসত জেনারেল ইলেকট্রিকের (জিই)। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই বৈচিত্র্যময় সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু একজনই—ইiলন মাস্ক।
টেসলা, স্পেসএক্স, এক্সএআই, নিউরালিংক, দ্য বোরিং কোম্পানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)—সব মিলিয়ে মাস্কের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি অঙ্গনের অন্যতম শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে স্টারলিংকের মতো বৈশ্বিক টেলিকম সেবা, নিউরাল ইমপ্লান্ট, ভূগর্ভস্থ টানেল প্রকল্প এবং এমনকি প্রজনন গবেষণায় ব্যক্তিগত বিনিয়োগ।
বিশ্লেষকদের মতে, মাস্ক এখন ধীরে ধীরে এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি বৃহৎ কংগ্লোমারেট কাঠামোয় আনার পথে হাঁটছেন। স্পেসএক্স, টেসলা ও এক্সএআইয়ের মধ্যে একীভূতকরণের সম্ভাবনা নিয়ে সাম্প্রতিক গুঞ্জন সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
ইতিহাসে ইলন মাস্ককে প্রায়ই হেনরি ফোর্ডের সঙ্গে তুলনা করা হলেও, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ তাঁকে জন ডি. রকফেলার কিংবা জ্যাক ওয়েলচের সঙ্গে তুলনা করছেন। বিশেষ করে জ্যাক ওয়েলচ যেভাবে জিইকে একটি দুর্বল শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বিশাল কংগ্লোমারেটে রূপ দিয়েছিলেন, সেই পথের সঙ্গেই মাস্কের কৌশলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে।
মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা এসঅ্যান্ডপি ৫০০–এর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি। এই বিপুল সম্পদ ও প্রভাবের কারণে ব্যক্তি মাস্ক ও তাঁর কোম্পানিগুলোর মধ্যে পার্থক্য ক্রমেই ঝাপসা হয়ে উঠছে।
বর্তমানে টেসলা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও শক্তি সংরক্ষণে, স্পেসএক্স মহাকাশ ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটে, এক্সএআই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়, নিউরালিংক মানব-মস্তিষ্ক সংযোগে এবং দ্য বোরিং কোম্পানি নগর পরিবহনে কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের আদান–প্রদানও বেড়েছে, যা ভবিষ্যৎ একীভূত কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ডেভিড ইয়োফির মতে, মাস্কের কৌশল জিই–এর চেয়েও বেশি ‘গিল্ডেড এইজ’-এর ধাঁচের। সেই সময় জে.পি. মরগান বা রকফেলারের মতো শিল্পপতিরা বিপুল সম্পদ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে একাধিক খাত একত্রে নিয়ন্ত্রণ করতেন। ইয়োফির ভাষায়, “এটি কেবল ব্যবসা নয়, ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের গল্প।”
তবে পার্থক্যও রয়েছে। গিল্ডেড এইজে নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রায় অনুপস্থিত, আর বর্তমান বিশ্ব তুলনামূলকভাবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু দেশে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ায় বড় করপোরেট শক্তির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাজনৈতিক প্রভাবও মাস্কের সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারে তাঁর বিপুল ব্যয় নিয়েও আলোচনা চলছে। ইতিহাস বলছে, একসময় জনমত ও নিয়ন্ত্রণের চাপেই শিল্পপতিদের ক্ষমতা সীমিত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মাস্ক যদি সত্যিই তাঁর একাধিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বড় কংগ্লোমারেটের যুগ ফিরতে পারে—যদিও আধুনিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বিশেষায়িত কোম্পানিকেই বেশি পছন্দ করেন। অর্থনীতির ভাষায়, কংগ্লোমারেট কাঠামোয় ‘মূল্যছাড়’ বা ভ্যালু ডিসকাউন্টের ঝুঁকিও থাকে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই—ইলন মাস্ক কি আধুনিক যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্পপতিতে পরিণত হচ্ছেন, নাকি নিয়ন্ত্রণ ও জনমতের দেয়ালে গিয়ে তাঁর এই বিস্তৃত সাম্রাজ্য একসময় থামবে? উত্তর দেবে সময়ই।