Saturday, January 10, 2026

সুদানে যুদ্ধের নীরব আর্তনাদ: যৌন সহিংসতার ভয়াবহ বাস্তবতা


ছবিঃ মারিয়াম (ছদ্মনাম), আরএসএফের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত বলে অভিযোগ করা ধর্ষণের একজন বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগী, ৬ জানুয়ারি আল জাজিরা আরবির প্রতিবেদক আসমা মোহাম্মদের কাছে তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

সুদানে চলমান সংঘাতে যৌন সহিংসতা যেন নীরব এক অস্ত্র। এই সহিংসতার শিকার নারীরা অধিকাংশ সময়ই ভয়ে, লজ্জায় ও সামাজিক চাপের কারণে মুখ খুলতে পারেন না। যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে পালাতে গিয়েও অনেকের জন্য ভয় আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

এমনই একজন মারিয়াম (ছদ্মনাম)। গত বছরের শুরুতে গেজিরা রাজ্য থেকে খার্তুমে যাওয়ার পথে তাঁর গাড়ি থামিয়ে দেয় সশস্ত্র লোকজন। গাড়ির যাত্রীদের মধ্য থেকে শুধু তাকেই আলাদা করে নেওয়া হয়। পরে একটি ফাঁকা ঘরে নিয়ে গিয়ে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়। পরিবারে ফিরে তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। তাঁর স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা ছিল র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)–এর সদস্য।

এ ঘটনা একা নয়। দারফুরের এল-ফাশের এলাকাতেও একই ধরনের ভয়াবহতা ঘটছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থী উম্মে কুলসুম (ছদ্মনাম) জানান, তিনি নিজ চোখে স্বজনদের হত্যা ও গণধর্ষণের দৃশ্য দেখেছেন। পরে তিনিও সেই সহিংসতার শিকার হন। তাঁর ভাষায়, আরএসএফ সদস্যরা এলাকা ঘিরে ফেলে প্রথমে পুরুষদের হত্যা করে, এরপর নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

নারী ও শিশুদের ওপর এই সহিংসতা যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তার প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে। আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের নারীদের নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে সুদানের ১৪টি রাজ্যে প্রায় ১,৩০০ যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, এসব অপরাধ পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। হামলার সময় ঘরে ঢুকে সশস্ত্ররা প্রায়ই প্রশ্ন করে ‘এই বাড়িতে কি কোনো মেয়ে আছে?’ তরুণী ও কিশোরীদের লক্ষ্য করেই অপহরণ, ধর্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি বন্দিত্ব চালানো হচ্ছে। অনেক নারীকে জোরপূর্বক রান্না, কাপড় ধোয়া কিংবা যৌন দাসত্বে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি কিছু নারীকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করার অভিযোগও রয়েছে।

আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশেষ করে মাসালিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই সহিংসতা শাস্তিমূলক ও জাতিগত নিপীড়নের রূপ নিয়েছে। আইনের শাসন ভেঙে পড়ায় অপরাধীরা কার্যত দায়মুক্তি পাচ্ছে, যা সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হাসপাতালগুলোতে। ওমদুরমান মাতৃসদন হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল প্রাপ্তবয়স্ক নারী নয়, এমনকি দুই বছরের কম বয়সী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অনেক কিশোরী ও তরুণী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাত সম্ভব হলেও অনেককে বাধ্য হয়ে সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে।

জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকেই শিশুদের ওপর শতাধিক যৌন সহিংসতার ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুও রয়েছে।

এই সহিংসতার পেছনে একটি সুসংগঠিত ধারা কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা প্রথমে ঘরে ঢুকে লুটপাট ও ধর্ষণ, এরপর প্রকাশ্য স্থানে হামলা, এবং শেষে দীর্ঘমেয়াদি আটক ও শোষণ।

এর মধ্যেই দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা বাড়ছে। খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে কোটি কোটি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে। আন্তর্জাতিক মহল কিছু আরএসএফ নেতার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও ভুক্তভোগী নারীদের জীবনে তার প্রভাব খুব সীমিত।

যুদ্ধ শেষ হলেও মারিয়াম, উম্মে কুলসুমসহ অসংখ্য নারীর জন্য লড়াই তখনো শেষ হবে না। সামাজিক লজ্জা, মানসিক আঘাত আর ন্যায়বিচারের অভাব সব মিলিয়ে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও দীর্ঘ, কঠিন পথ।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন