Saturday, November 7, 2026

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা লড়াইয়ের প্রস্তুতি জামায়াত-এনসিপির, জোটে দূরত্বের গুঞ্জন


প্রতীকী ছবিঃ নতুন রাজনৈতিক কৌশলে জামায়াত-এনসিপি (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলে পরিবর্তন আনছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ১১ দলীয় ঐক্যের অংশীদার হলেও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার পরিবর্তে পৃথকভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দল দুটি। তাদের এমন অবস্থানে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোটের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে দুই দলের নেতারা বলছেন, নির্বাচনে আলাদা অবস্থান নেওয়ার অর্থ জোটে ভাঙন নয়; বরং নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর কৌশল।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করে তাঁদের নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। একই পথে এগোচ্ছে এনসিপিও। দলটি বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি কার্যক্রম জোরদার করছে। ফলে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে একক প্রার্থী নিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে জোটের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শনিবারের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট নেতারা এ ধরনের আলোচনাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।

এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী কিংবা ১১ দলীয় ঐক্যের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ বা দূরত্ব নেই। তাঁর মতে, দল হিসেবে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক ভিত্তি বিস্তারের জন্য এনসিপি নিজস্ব পরিকল্পনায় এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, ফ্যাসিবাদের অবসান, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অভিন্ন। বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তাঁদের ঐক্য অটুট রয়েছে। তবে নির্বাচনে নিজস্ব কৌশল অনুসরণ করার অধিকার প্রতিটি দলের রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও দুই দলের মধ্যে দূরত্বের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, নাহিদ ইসলাম ব্যক্তিগত কারণে লংমার্চে অংশ নিতে পারেননি। এটিকে রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংসদ ও সংসদের বাইরে দুই দল একসঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

হামিদুর রহমান আযাদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এ নিয়ে জোটের কার্যক্রমে কোনো সংকট তৈরি হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্বাচনি সমঝোতার পথও খোলা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি দলীয় কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও নির্বাচনি প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে দলটি। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।

তবে জোটের ভেতরে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ঐকমত্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে ভিন্নমতও দেখা যাচ্ছে। জোটসংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার মতে, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং নির্বাচনি কৌশলে মতপার্থক্য থাকলে স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে জোটের ভেতরে প্রার্থী বাছাই এবং সম্ভাব্য জয়ের হিসাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত ও এনসিপি ইতোমধ্যে পৃথক প্রার্থী নির্ধারণ করেছে। উত্তর সিটিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনের নাম সামনে এসেছে। দক্ষিণ সিটিতে দলটির প্রার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে এনসিপি ঢাকা উত্তর সিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণ সিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে। এর আগে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলটির অবস্থানে কিছু পরিবর্তন এলেও বর্তমানে দুই সিটির জন্য পৃথক প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনি প্রস্তুতি চলছে।

এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে দলের ভেতরে ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে সব মতামত বিবেচনার পর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁর মতে, জামায়াতও যখন নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এনসিপির এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে জোটের দূরত্ব হিসেবে দেখার কারণ নেই।

সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি যাচাইয়ের পথে হাঁটছে। নির্বাচনে পৃথক অবস্থান নিলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অভিন্ন দাবিতে দুই দলের সমন্বয় কতটা বজায় থাকে, সেটিই এখন ১১ দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন