- ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলার কথা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার তিনি জানান, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। তবে একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান সেখানে নতুন করে একটি বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছিল। মার্কিন বাহিনী সেটি পাঁচ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, হামলাটি ছিল ‘ছোটখাটো’।
ট্রাম্পের বক্তব্যের কিছুক্ষণ আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর প্রকাশ করে। হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত দ্বীপটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহনপথ এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দেশটির সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতিও প্রচার করেছে। এতে বলা হয়, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাবাহিনী কেশম দ্বীপের আকাশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন শনাক্ত করে সেটি ভূপাতিত করেছে।
দ্বীপটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পরিস্থিতিকে ‘তুলনামূলক শান্ত’ বলে বর্ণনা করে। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বক্তব্যে সেন্টকমের একজন কর্মকর্তা জানান, তাঁরা এ-সংক্রান্ত খবর সম্পর্কে অবগত আছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।
এদিকে শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্যের বিনিময়ে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। পাশাপাশি তথ্যদাতাদের প্রয়োজনে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগও রাখা হয়েছে। পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বিজ্ঞানীদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
সামরিক হামলার কথা স্বীকার করলেও ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তেহরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের যোগাযোগ চলছে এবং ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। আলোচনায় ‘অনেক অগ্রগতি’ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে কী বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এমন খবর প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের প্রচারণা কেবল তাদেরই সুবিধা দেবে, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে এবং অঞ্চলকে অস্থিতিশীল রাখতে চায়।
এর আগে শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক উন্মুক্ত আলোচনায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সংকটের সমাধান না করে ফেলে রাখা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের আন্তরিক উদ্যোগ রয়েছে। তেহরানের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির ইতিবাচক অবস্থানের কারণেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি বড় ধাক্কা খাওয়ার পর ইরানে এটিই প্রথম মার্কিন হামলার ঘটনা। মঙ্গলবারের নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ট্রাম্প ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা।
নির্বাচনের পর থেকে ইরানকে নিয়ে কখনো কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আবার কখনো যুদ্ধের সমাধান কাছাকাছি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, প্রয়োজনে ইরানের বাকি অংশও ‘ধ্বংস’ করতে হতে পারে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা শিগগিরই জানা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী বড় ধরনের অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বুধবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডার। তাঁদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে এবং এক ডজনের বেশি জাহাজে হাজার হাজার মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্য প্রস্তুত রয়েছেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশ পেলে তাঁরা ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন।
ট্রাম্পের সামরিক হুমকি ও নতুন করে হামলার আশঙ্কার মধ্যে তেহরানও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। ফলে একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে আলোচনার অগ্রগতির দাবি দুইয়ের মধ্যে দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক।