- ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে কোনো দল বা জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে রোববার (৮ নভেম্বর) সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য একজন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের আলোচনা বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। আলোচনায় ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটের ৬৭ জন সদস্য আইজেনকোটের পক্ষে এবং ৪৬ জন নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে এই সমর্থনের হিসাবই যে সরকার গঠনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে, তা নয়। কারণ আইজেনকোটের পক্ষে থাকা ৬৭ সদস্যের মধ্যে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সংসদ সদস্যও রয়েছেন, যাদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে তিনি রাজি নন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সমর্থনে থাকা ৪৬ জন সংসদ সদস্য তাঁর জোটের মোট ৫৩টি আসনের চেয়েও কম। দীর্ঘদিনের মিত্র অতি-গোঁড়া ইহুদিদের দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অতি-গোঁড়া ইহুদিদের অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে নেতানিয়াহুর জোটের ব্যর্থতার কারণে তাঁকে সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হারজগ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কাউকে সমর্থন দেননি। তাঁর মতে, সংসদ সদস্যদের সমর্থনের সংখ্যা দেখে পরিস্থিতি সহজ মনে হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের অভ্যন্তরীণ ও পারস্পরিক বিরোধের কারণে সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা নির্ধারণ করা কঠিন।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকোটকে সমর্থন দেওয়া ইহুদি-নেতৃত্বাধীন চারটি দলের আসন ৪৮টি। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্টের আসন ১১টি এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম দলের আসন আটটি।
আইজেনকোটের পক্ষে থাকা আরব দলগুলোর ১৯ জন সংসদ সদস্য যুক্ত হলে তাঁর সমর্থন ৬৭-তে দাঁড়ায়। কিন্তু তিনি এসব দলকে সরকারে নিতে অনিচ্ছুক। ফলে সরকার গঠনের জন্য তাঁকে বিকল্প সমর্থন খুঁজতে হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে অতি-গোঁড়া ইহুদিদের দুই দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন পেলে আইজেনকোটের আসনসংখ্যা ৬১-তে পৌঁছাবে। ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম শর্তসাপেক্ষে সমর্থনের ইঙ্গিত দিলেও শাস বুধবার নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুকে সরকার গঠন করতে হলে বিরোধী শিবিরের অন্তত একটি দলকে নিজের পক্ষে আনতে হবে। দুই নেতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদ ভাগাভাগি করে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে যোগ দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন তাঁর অনেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। জয়েন্ট লিস্ট সরাসরি সরকারে অংশ নেওয়ার বদলে বাইরে থেকে আইজেনকোটকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে রাম সরকারে যোগ দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে।
তবে আইজেনকোট আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। রাম দলের নেতা মানসুর আব্বাস হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান জানালেও সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিতে রাজি হননি।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য কোনো প্রার্থীর ৬১টি আসনের সমর্থন থাকতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। প্রস্তাবিত সরকার পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয়ী হলে ৬১টির কম আসন নিয়েও সরকার গঠন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থন আইজেনকোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পরবর্তী সময়ে অতি-গোঁড়া দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগও থাকবে।
জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমাদ তিবি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক অংশীদারত্ব প্রত্যাখ্যান করা হলে তা প্রমাণ করবে, ইসরায়েল সব নাগরিকের জন্য পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র নয়; বরং একটি জাতিগত আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র।
আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান। জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর জনদাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা আইজেনকোটকে সমর্থন দিয়েছে। তবে এই সমর্থনের অর্থ এই নয় যে, নেতানিয়াহুর নীতি কিংবা ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে উসকানির বিষয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থান নিয়ে তাদের সব আপত্তি দূর হয়েছে।
সরকারের বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য কয়েকটি বিষয়ে নিশ্চয়তা চায় দলগুলো। এর মধ্যে রয়েছে বাড়িঘর ভাঙা বন্ধ, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে উসকানি প্রতিরোধ, আরব জনগোষ্ঠীর এলাকায় অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট অগ্রগতি।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা আহমাদ তিবি বলেন, এ ধরনের একটি ‘সংস্কারমূলক সরকার’ ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করবে কিংবা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে এমন প্রত্যাশা তাঁর নেই। তবে এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের কিছু সমস্যার সমাধান, বিশেষ করে তাঁদের বসবাসের এলাকায় সহিংস অপরাধ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাম দলের নেতা মানসুর আব্বাসও নেতানিয়াহুর পাশাপাশি কট্টর ডানপন্থী নেতা অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের প্রভাব থেকে সরকারকে সরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য প্রথমে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এই সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যাবে। প্রথম প্রার্থী ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তিনিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানাতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনের জন্য শেষবারের মতো ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে।
সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নেতানিয়াহু।
আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক নেহরু জামহুর বলেছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর আবার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুও এমন পরিস্থিতি প্রত্যাশা করতে পারেন। পুনর্নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধীদের শক্তি কমানো এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার সুযোগ নিতে পারেন তিনি।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের লড়াইয়ে আইজেনকোট সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগত সমর্থনে এগিয়ে থাকলেও আরব দলগুলোকে সরকারে না নেওয়ার অবস্থান তাঁর সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জন্যও প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করা সহজ হচ্ছে না। ফলে প্রেসিডেন্ট হারজগের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক দর-কষাকষিই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের ভাগ্য।