- ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছেন মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল এল-সায়েদ। ‘হাবিবি পিএসি’ নামে একটি রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) গঠন করেছেন তিনি। নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর এবার অন্য প্রার্থীদের সমর্থন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) বৃহস্পতিবারের নথিতে দেখা যায়, এল-সায়েদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘হাবিবি পিএসি’ একটি লিডারশিপ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। এ ধরনের কমিটি কোনো রাজনীতিকের নিজস্ব নির্বাচনী প্রচার তহবিল থেকে আলাদা। সাধারণত অন্য প্রার্থীদের সহায়তা, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে অর্থায়ন এবং আইনপ্রণেতাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে এসব কমিটি ভূমিকা রাখে।
‘হাবিবি’ আরবি ভাষার একটি স্নেহসূচক শব্দ। এর অর্থ ‘প্রিয়’ বা ‘আমার প্রিয়জন’। নির্বাচনী প্রচারের সময় শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করতেন এল-সায়েদ। ডেট্রয়েটে বিজয় ভাষণেও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘জেডি, হাবিবি এটা বেশ মজার বিষয় যে সংবিধান অনুযায়ী জানুয়ারিতে তোমাকেই আমাকে শপথ পড়াতে হবে।’
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর লিডারশিপ পিএসি নিবন্ধন করা নতুন ডেমোক্র্যাট নেতাদের মধ্যে এল-সায়েদও রয়েছেন। এফইসির নথি অনুযায়ী, অ্যারিজোনার নবনির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য আমিশ শাহ ‘প্যাকস্ট্রিট বয়’, আইওয়ার নবনির্বাচিত সিনেটর জশ টুরেক ‘হুইলপ্যাক’ এবং নর্থ ক্যারোলাইনার নবনির্বাচিত সিনেটর রয় কুপার ‘ওয়ান এনসি পিএসি’ নামে কমিটি গঠন করেছেন।
রাজনৈতিক অর্থায়ন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ওপেনসিক্রেটসের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী আইনপ্রণেতারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে লিডারশিপ পিএসি ব্যবহার করেন। এসব কমিটির মাধ্যমে অন্য প্রার্থী, নিজ দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কমিটিকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এতে সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দলীয় নেতৃত্ব কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ারম্যান পদ পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
ওপেনসিক্রেটসের হিসাবে, ২০২৪ সালের নির্বাচনী চক্রে লিডারশিপ পিএসিগুলো ফেডারেল পর্যায়ের প্রার্থীদের মোট ৭৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিল। এর বড় অংশ পেয়েছিল রিপাবলিকানরা। তবে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছিল একটি ডেমোক্র্যাটিক লিডারশিপ পিএসি।
মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হওয়া এল-সায়েদ মিশরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান। নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সিনেটর টেড ক্রুজ তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কোনো প্রমাণ উপস্থাপন না করেই তাঁকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দেওয়া এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলার ঘটনাও ঘটে।
নির্বাচনের কয়েক দিন আগে মিশিগানের ওয়াইয়ান্ডট শহরে এক সমাবেশে আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এল-সায়েদ বলেন, করদাতাদের অর্থ বিদেশি সরকারগুলোর পেছনে ব্যয় না করে দেশের মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যবহার করা উচিত। তাঁর ভাষায়, গণহত্যা বা বর্ণবৈষম্যে জড়িত বিদেশি সরকারগুলোকে অর্থায়নের পরিবর্তে দেশের মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, শুধু ট্রাম্পকে পরাজিত করলেই হবে না; যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাঁকে ক্ষমতায় এনেছে, সেটিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব কমানো ছিল তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলোর অন্যতম। বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, অর্থ আর সাধারণ মানুষের মধ্যে লড়াই হলে সাধারণ মানুষও জয়ী হতে পারে এই নির্বাচনের ফল সেটিই দেখিয়েছে।
তবে এল-সায়েদের জয় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ওপেনসিক্রেটস জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয় প্রায় ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এ ব্যয় ছিল ৮৯০ কোটি ডলার।
সুপার পিএসিগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত নির্বাচনের বাইরের ব্যয় এবার ৩৯০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা ২০২২ সালের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, যেসব অর্থদাতার পরিচয় প্রকাশ করা হয় না, সেই ‘ডার্ক মানি’র পরিমাণ ইতোমধ্যে অন্তত ১৪৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ পুরো নির্বাচনী চক্রে এ ধরনের অর্থায়নের রেকর্ড ছিল ১৩৫ কোটি ডলার।
ওপেনসিক্রেটসের বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, নির্বাচনের বাইরের ব্যয়ে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো উদারপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় প্রায় ৩৬ কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে। তবে প্রার্থী পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় প্রায় ৮০ কোটি ডলার বেশি ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমন ব্যয়বহুল রাজনৈতিক পরিবেশে এল-সায়েদের ‘হাবিবি পিএসি’ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে সিনেটে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নতুন এই কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।