- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
স্মার্টফোন বাজারে প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে ডিভাইসের প্রযুক্তিতে নয়, বরং ব্যবহারকারীরা কীভাবে ফোন হাতে পাবেন সেই ব্যবস্থায়। দাম বাড়তে থাকা প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের বাজার ধরে রাখতে অ্যাপল, স্যামসাংসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন লিজ, সাবস্ক্রিপশন এবং গ্যারান্টিযুক্ত বাইব্যাক কর্মসূচির দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের দাম বাড়ার পাশাপাশি নতুন মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন কমে যাওয়ায় ব্যবহারকারীরা আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় একই ডিভাইস ব্যবহার করছেন। ফলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ফোন বিক্রির সুযোগ হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত আপগ্রেডে উৎসাহ দিতে বিকল্প মালিকানা মডেল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে Apple Upgrade নামে নতুন একটি কর্মসূচি চালু করেছে অ্যাপল। আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্লারনার (Klarna) সঙ্গে অংশীদারত্বে চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় গ্রাহকরা মাসিক অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে আইফোন, ম্যাক, আইপ্যাড বা অ্যাপল ওয়াচ ব্যবহার করতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময় পর তারা ডিভাইস আপগ্রেড, ফেরত দেওয়া অথবা কিনে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টিম কুক জানিয়েছেন, যারা নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য এই আপগ্রেড পরিকল্পনা সহজ সমাধান হতে পারে। তিনি বলেন, অ্যাপল পণ্যের পুনর্বিক্রয় মূল্য তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ ধরনের মডেলের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ডিভাইসগুলো উপযুক্ত।
অন্যদিকে, স্যামসাং ভারতের বাজারে Galaxy Forever কর্মসূচির মাধ্যমে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যবস্থায় অর্থায়নের সুবিধার সঙ্গে নির্দিষ্ট বাইব্যাক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকরা তুলনামূলক সহজে নতুন গ্যালাক্সি ফ্ল্যাগশিপ ফোনে যেতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারের গড় সময় ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী একটি স্মার্টফোন বদলের গড় সময় প্রায় চার বছরে পৌঁছাতে পারে, যা ২০২৫ সালে ছিল প্রায় সাড়ে তিন বছর।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রিমিয়াম স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা এখন গড়ে প্রায় ৪২ মাস একটি ডিভাইস ব্যবহার করছেন। কয়েক বছর আগে এই সময় ছিল প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ মাস।
ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিসের বিশ্লেষক ম্যাক্স ওয়েইনবাখ বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি সফল করতে হলে একটি শক্তিশালী সেকেন্ডারি বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বাজার থাকা জরুরি। তার মতে, লিজ ও বাইব্যাক ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরোনো ডিভাইসগুলো সহজে রিফারবিশড বাজারে ফিরে আসে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মডেল সবার জন্য লাভজনক নাও হতে পারে। যারা তিন, চার বা পাঁচ বছর একই ফোন ব্যবহার করেন, তাদের জন্য সরাসরি ফোন কিনে নেওয়াই অনেক সময় বেশি সুবিধাজনক হতে পারে।
লোন মার্কেটপ্লেস লেন্ডিংট্রির প্রধান ভোক্তা অর্থ বিশ্লেষক ম্যাট শুলজ বলেন, যারা নিয়মিত এক বা দুই বছর পরপর ফোন পরিবর্তন করেন, তাদের জন্য সাবস্ক্রিপশন বা লিজ ব্যবস্থা আর্থিকভাবে যুক্তিসংগত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু গ্রাহকদের দ্রুত ফোন বদলাতে উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক ধরে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবেও কাজ করছে এটি।
আইডিসির ডিভাইস গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাভকেন্দর সিং বলেন, “মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রাহকের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ধরে রাখা, নিয়মিত আপগ্রেডের চক্র তৈরি করা এবং পুনর্বিক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত ডিভাইস সংগ্রহ নিশ্চিত করা।”
যুক্তরাষ্ট্রে মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো বহুদিন ধরেই কিস্তি ও ট্রেড-ইন সুবিধা দিয়ে আসছে। তবে নতুন প্রবণতা হলো, এখন প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি এই সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে।
এই পরিবর্তন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যও সুযোগ তৈরি করছে। ভারতের BytePe-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্মার্টফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের অধিকাংশ গ্রাহক সরাসরি কেনার বদলে সাবস্ক্রিপশন বেছে নিচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের Raylo এবং জার্মানির Grover-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মাসিক পেমেন্টের মাধ্যমে স্মার্টফোন ও ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে।
তবে সরাসরি ফোন কেনার প্রচলন একেবারে হারিয়ে যাবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের স্মার্টফোন ট্রেড-ইন প্রতিষ্ঠান Cashify-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা মানদীপ মানোচা বলেন, লিজ, সাবস্ক্রিপশন ও সরাসরি মালিকানা তিন ধরনের ব্যবস্থারই নিজস্ব জায়গা থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে প্রিমিয়াম স্মার্টফোন বাজারে এই ধরনের বিকল্প মালিকানা ব্যবস্থা আরও জনপ্রিয় হতে পারে। তবে গ্রাহকদের জন্য কোন মডেল সবচেয়ে সুবিধাজনক হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবহারের ধরন, আপগ্রেডের অভ্যাস এবং আর্থিক সক্ষমতার ওপর।