- ০১ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সিলিকন ভ্যালিতে নতুন এক প্রজন্মের স্টার্টআপ উদ্যোক্তার উত্থান ঘটছে। কিশোর বয়সেই কোডিং শেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে প্রযুক্তিপণ্য তৈরি এবং অল্প সময়ের মধ্যে কোটি ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহ—এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
তবে দ্রুত সাফল্যের এই সুযোগের সঙ্গে বাড়ছে প্রত্যাশার চাপও। বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের অর্থ, অল্প সময়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির দাবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিটি পদক্ষেপ প্রকাশ্যে চলে আসায় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ গড়ে তোলার পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও কঠিন হয়ে উঠেছে।
কাজাখস্তানের ১৯ বছর বয়সী আরলান রাখমেতঝানভ এমনই এক তরুণ উদ্যোক্তা। তার কাছে সাফল্য ও ব্যর্থতার ব্যবধান যেন খুবই সংকীর্ণ। তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চান, যার মূল্য একদিন গুগলের সমপর্যায়ে পৌঁছাবে। আর তা না হলে নিজের স্বপ্নকে ব্যর্থ বলে মনে করেন তিনি।
১৫ বছর বয়সে কোডিং শুরু করেন আরলান। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে কয়েকটি গ্রীষ্মকালীন প্রযুক্তি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এরপর লিংকডইনে ইয়াই কম্বিনেটরের (ওয়াইসি) সঙ্গে যুক্ত যত প্রতিষ্ঠাতাকে পাওয়া সম্ভব, তাদের কাছে সরাসরি বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত একজন উদ্যোক্তা তার প্রথম স্টার্টআপে অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর।
বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান নোজোমিও ইয়াই কম্বিনেটরের সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। এআই এজেন্টের জন্য তৈরি প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি বিভিন্ন সফটওয়্যার সেবা খুঁজে বের করা এবং সেগুলো ব্যবহারে সহায়তা করে। এখন পর্যন্ত কোম্পানিটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে।
আরলানের ভাষায়, তরুণ অনেক প্রতিষ্ঠাতাই এখন ‘জয় অথবা পরাজয়’—এমন মানসিকতা নিয়ে কাজ করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য দ্রুত এগিয়ে যাওয়া এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা।
এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সফটওয়্যার তৈরি আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে কম সময়ে পণ্য তৈরি ও পরীক্ষা করা সম্ভব হওয়ায় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়াও তরুণদের স্টার্টআপ গড়ার সুযোগ বেড়েছে।
১৯ বছর বয়সী প্রাঞ্জলি আওয়াস্থি এ প্রবণতার আরেক উদাহরণ। কিশোর বয়সে এআইভিত্তিক একটি উদ্যোগ শুরু করার জন্য তিনি উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও স্টার্টআপে পুরো সময় দেওয়ার জন্য সেখান থেকেও বেরিয়ে আসেন।
এরপর তিনি স্ল্যাশি নামে একটি এআইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীদের ই-মেইল ইনবক্স পরিচালনায় সহায়তা করে এবং নিজেদের ‘ই-মেইলের জন্য কার্সর’ হিসেবে পরিচিত করে। ইয়াই কম্বিনেটর–সমর্থিত এই স্টার্টআপ পরিচালনার এক বছরের বেশি সময় পর তিনি নতুন আরেকটি উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন, যা এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
প্রাঞ্জলি জানান, ১৪ বা ১৫ বছর বয়সে বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজের ব্যবসার পরিকল্পনা তুলে ধরলে অনেকেই জানতে চাইতেন, এত কম বয়সে তিনি কেন কোম্পানি গড়তে চান। তবে এখন কম বয়সী উদ্যোক্তাদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলেছে।
প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ভারমিলিয়নের সাধারণ অংশীদার অ্যাশলি স্মিথের মতে, বর্তমানে তরুণ উদ্যোক্তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বয়স বা চাকরির অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বরং গিটহাবে তাদের কাজ, ওপেন সোর্স প্রকল্পে অবদান, গড়ে তোলা প্রযুক্তি কমিউনিটি এবং নতুন এআই টুল ব্যবহারের দক্ষতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, কলেজে পড়ার সময় বা কম বয়সে অনেক তরুণের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ বেশি থাকে। পূর্ণকালীন চাকরি, পরিবার বা আর্থিক দায়িত্বে থাকা মানুষের তুলনায় তারা নতুন ধারণা নিয়ে দ্রুত কাজ করতে পারেন।
স্মিথ জানান, তার বিনিয়োগ তালিকার উল্লেখযোগ্য অংশই ৩০ বছরের কম বয়সী প্রতিষ্ঠাতাদের গড়া কোম্পানি। এর মধ্যে কয়েকজনের বয়স ২১ বছরেরও কম। তার মতে, অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলেও নতুন কিছু নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এবং ব্যর্থতার ভয় কম থাকায় তরুণরা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন।
তবে স্টার্টআপ বাজার এখন আগের চেয়ে অনেক কম সহনশীল বলেও মনে করেন তিনি। বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লেও সেই অর্থের সঙ্গে দ্রুত ফল দেখানোর চাপও যুক্ত হয়েছে।
বর্তমানে অ্যাক্সিলারেটর, ইনকিউবেটর এবং প্রি-সিড তহবিলের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থ সংগ্রহের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু একসময় যেখানে প্রতিষ্ঠাতারা কয়েক বছর ধরে পণ্য উন্নয়ন ও বাজার যাচাইয়ের সুযোগ পেতেন, এখন সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিনিয়োগকারীরা দ্রুত সফল হওয়া কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মতো প্রবৃদ্ধি দেখতে চান। ফলে ব্যতিক্রমী সাফল্যকে অনেক সময় সাধারণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই চাপের কারণে তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যবসার প্রকৃত অগ্রগতির পাশাপাশি নিজেদের সফল হিসেবে উপস্থাপনের প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনিয়োগ সংগ্রহ, নতুন পণ্য উন্মোচন, ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক কিংবা কৌশল পরিবর্তনের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে উদ্যোক্তাদের শুধু ভালো পণ্য তৈরি করলেই হচ্ছে না; তাদের সাফল্যের দৃশ্যমান উপস্থিতিও তৈরি করতে হচ্ছে।
প্রাঞ্জলি আওয়াস্থির মতে, দুই দশক আগে একটি স্টার্টআপ দীর্ঘ সময় আড়ালে থেকে পণ্য উন্নয়ন করতে পারত। এখন লিংকডইন, এক্সসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিটি বিনিয়োগ, সাফল্য, ব্যর্থতা ও ব্যবসায়িক পরিবর্তন প্রকাশ্যে আলোচিত হয়।
বিনিয়োগকারী টিমোথি চেন বলেন, আগে একটি স্টার্টআপকে মূলত বাজারের বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো। এখন একই এলাকার অন্য উদ্যোক্তা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গেও নিজেদের তুলনা করতে হচ্ছে।
বর্তমানে আকর্ষণীয় পণ্য উন্মোচনের ভিডিও, প্রচারণামূলক কনটেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় থাকার প্রবণতাও বেড়েছে। কয়েক বছর আগেও স্টার্টআপ প্রচারণায় এ ধরনের বিষয় এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
এআই ডেস্কটপ সহকারী তৈরি করা প্রতিষ্ঠান অ্যাটেনশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ২০ বছর বয়সী এইডান গুওর মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের অনেক চাপ নিজেদের ভেতর থেকেই আসে। কোম্পানি পরিচালনা, নতুন বিষয় শেখা, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ এবং ব্যর্থতার আশঙ্কা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়।
তার মতে, এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল বা ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা যুক্ত হওয়ায় মানসিক চাপ আরও বাড়ে।
তবে তরুণ উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের পরিবেশ বদলালেও সফল স্টার্টআপের মৌলিক বিষয়গুলো অপরিবর্তিত রয়েছে।
প্রাঞ্জলি আওয়াস্থির মতে, প্রয়োজনীয় কাজের ওপর মনোযোগ ধরে রাখতে পারলে বাইরের চাপ সামলানো সম্ভব। আরলান রাখমেতঝানভ মনে করেন, যে প্রতিষ্ঠান কার্যকর পণ্য তৈরি করে এবং নিয়মিত গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, শেষ পর্যন্ত তারাই এগিয়ে যায়।
অ্যাশলি স্মিথের ভাষায়, একটি ভালো স্টার্টআপ গড়তে প্রয়োজন দৃঢ় বিশ্বাস, নিজের অবস্থান সম্পর্কে সৎ মূল্যায়ন এবং গ্রাহকের সমস্যার সমাধানে গভীর মনোযোগ। এসব গুণের সঙ্গে বয়সের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে এআই খাতে বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও তত বাড়ছে। দ্রুত সাফল্যের প্রত্যাশার মধ্যে বাস্তব ব্যবসায়িক অগ্রগতি, নৈতিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পণ্য উন্নয়নের ভারসাম্য ধরে রাখাই তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।