Tuesday, October 20, 2026

কৃত্রিম সাফল্যের আবরণে স্টার্টআপ জগৎ, ‘ফ্যাসাডিং’ নিয়ে নতুন গবেষণা


ছবিঃ ডলার (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি, বড় মূল্যায়ন এবং বিপুল বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা অনেক সময় উদ্যোক্তাদের বাস্তবতার চেয়ে বড় সাফল্যের ছবি তুলে ধরতে উৎসাহিত করে। তবে সেই অতিরঞ্জন কখন প্রতারণায় রূপ নেয়, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ ও ফ্রান্সের এমলিয়ন বিজনেস স্কুলের এক গবেষণা।

গবেষকদের মতে, স্টার্টআপে জালিয়াতির দায় শুধু প্রতিষ্ঠাতাদের ওপর চাপিয়ে দিলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ, দ্রুত ফল দেখানোর চাপ এবং যথাযথ যাচাই ছাড়া বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার মাধ্যমে কিছু বিনিয়োগকারীও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

গত জুনে অনলাইনে প্রকাশিত গবেষণাটিতে ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এবং বিচার বিভাগে (ডিওজে) প্রযুক্তি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দেওয়ানি ও ফৌজদারি সিকিউরিটিজ জালিয়াতির মামলাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার জন্য এমন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও কোম্পানিগুলোর একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে ওই সময়ের মধ্যে জালিয়াতির অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন আলোচিত প্রতিষ্ঠাতা জালিয়াতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ফ্র্যাঙ্কের চার্লি জ্যাভিস, কালডারের গোকচে গুভেন, টেরাফর্ম ল্যাবসের ডো কওন এবং গেমঅন–সংশ্লিষ্ট আলেকজান্ডার ও ভ্যালেরি লাউ বেকম্যানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণাটির অন্যতম লেখক টিম ওয়েইসের মতে, স্টার্টআপ জগতে প্রতারণা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, বাস্তবে সমস্যাটি তার চেয়েও বেশি বিস্তৃত এবং অনেক ক্ষেত্রে তা এক ধরনের স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতাদের ওপর দ্রুত বড় হওয়ার চাপ তৈরি করা হলেও সেই প্রবৃদ্ধি বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা সব সময় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে কিছু উদ্যোক্তা সেই ব্যবধান আড়াল করতে অসৎ পথ বেছে নিতে পারেন।

গবেষণায় এই প্রক্রিয়াকে ‘ফ্যাসাডিং’ বা কৃত্রিম সাফল্যের আবরণ তৈরির ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে প্রতারণার প্রবণতাকে তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে—প্রাথমিক বা ‘সারফেস ফ্যাসাডিং’, জোরদার বা ‘রিইনফোর্সড ফ্যাসাডিং’ এবং গভীর বা ‘ডিপ ফ্যাসাডিং’।

প্রথম ধাপে প্রতিষ্ঠাতারা কোম্পানির বর্তমান সাফল্য, গ্রাহকসংখ্যা বা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাস্তবতার চেয়ে বড় দাবি করতে পারেন। গবেষকদের মতে, এটি কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা তুলে ধরা বা বড় বাজারের সম্ভাবনা দেখানোর চেয়ে এক ধাপ বেশি বিভ্রান্তিকর আচরণ।

পরবর্তী ধাপে সেই দাবিগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ভুয়া নথি, কৃত্রিম চুক্তি, জাল চালান কিংবা অস্তিত্বহীন আয়ের হিসাব তৈরি করা হতে পারে। গবেষণায় একটি মোবাইল অ্যাপ পরীক্ষাসেবা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে ভুয়া গ্রাহকচুক্তি ও চালান তৈরি করে আয় দেখানো হয়েছিল। পরে এসব নথি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ মূল্যায়নে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ সংগ্রহ করে।

সবশেষ ধাপে প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েও ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হতে পারে। কৃত্রিম ডেমো, সাজানো প্রযুক্তিপ্রদর্শন কিংবা বাস্তবে না থাকা সক্ষমতাকে কার্যকর হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে এক ধরনের ‘সমান্তরাল বাস্তবতা’ তৈরি করা হয়।

গবেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা সব সময় প্রতারণার নিরীহ শিকার নাও হতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে অত্যধিক প্রবৃদ্ধির চাপ প্রতিষ্ঠাতাদের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। আবার অতীতে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা কোনো উদ্যোক্তাকে নতুন উদ্যোগে পুনরায় অর্থায়ন করাও বাজারে ভুল বার্তা দিতে পারে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি সাম্প্রতিক গবেষণায় ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল–সমর্থিত স্টার্টআপের বিরুদ্ধে হওয়া ৬৫৪টি জালিয়াতির মামলা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সামগ্রিকভাবে স্টার্টআপ জালিয়াতির ঘটনা খুব বেশি না হলেও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অর্থায়ন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার হার তুলনামূলক বেশি।

গবেষণাটিতে আরও বলা হয়, অতিরিক্ত উত্তপ্ত বিনিয়োগ পরিবেশে এবং দুর্বল তদারকি ও অপর্যাপ্ত যাচাইয়ের মধ্যে যেসব স্টার্টআপ যাত্রা শুরু করে, ভবিষ্যতে তাদের জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি হতে পারে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পরিচালনা পর্ষদযুক্ত স্টার্টআপে জালিয়াতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠাতানিয়ন্ত্রিত বোর্ডের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারী নিয়ন্ত্রিত বা যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকা বোর্ডের কোম্পানির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে জালিয়াতিতে জড়াতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতীতে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলেও অনেক প্রতিষ্ঠাতার নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এমনকি আলোচিত মামলার পরও নতুন বিনিয়োগকারীরা আগের অনিয়মকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখান।

গবেষকদের মতে, সিলিকন ভ্যালির ‘ব্যর্থতাকে গ্রহণ করার’ সংস্কৃতি অনেক সময় ব্যর্থতার কারণ এবং ইচ্ছাকৃত অনিয়মের মধ্যে পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল–সমর্থিত অনেক কোম্পানি দীর্ঘ সময় ব্যক্তিমালিকানাধীন থাকায় তাদের কার্যক্রম তুলনামূলক কম জনসম্মুখে আসে। অন্যদিকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রক তদারকির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

এই পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পাওয়ার পর স্টার্টআপগুলোর ওপর নিয়মিত তদারকি ও আনুষ্ঠানিক নিরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছেন গবেষক টিম ওয়েইস। তার মতে, বর্তমানে সাধারণত হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগ, বিনিয়োগকারীর মামলা বা সাবেক কর্মীদের অভিযোগের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে। এর পরিবর্তে বড় বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই নিয়মিত যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠাতাদের ওপর অবাস্তব প্রবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি এবং করপোরেট সুশাসনে ব্যর্থতার দায় শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

গবেষণাটির মূল বার্তা হলো—স্টার্টআপ জালিয়াতি প্রায়ই একক কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। প্রতিষ্ঠাতা, বিনিয়োগকারী, পরিচালনা পর্ষদ এবং পুরো অর্থায়ন ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক ও চাপের মধ্যেই অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্টার্টআপে দ্রুত বিনিয়োগ ও উচ্চ মূল্যায়নের বর্তমান প্রবণতার মধ্যে উদ্যোক্তাদের দাবি যাচাই, বিনিয়োগকারীদের যথাযথ সতর্কতা এবং শক্তিশালী করপোরেট সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন