Tuesday, July 28, 2026

রোবটকে ‘মানুষের মতো’ শেখাতে মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার, নতুন প্রযুক্তিতে বাজি ধরেছে এনকোর্ড


ছবিঃ রোবট (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পরবর্তী বড় লড়াই এখন আর শুধু উন্নত মডেল তৈরিতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বাস্তব পৃথিবীর মানসম্মত প্রশিক্ষণ ডেটা সংগ্রহ। সেই লক্ষ্যেই নতুন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টার্টআপ এনকোর্ড (Encord)। প্রতিষ্ঠানটি এবার মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ (ব্রেইন ওয়েভ) বিশ্লেষণ করে রোবটকে আরও দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান লিয়ান্দ্রো শহরে অবস্থিত এনকোর্ডের পরীক্ষাগারে চলছে এই ব্যতিক্রমী গবেষণা। সেখানে প্রশিক্ষকরা বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজ—যেমন জেঙ্গা খেলা, কফি ঢালা কিংবা সূক্ষ্ম যান্ত্রিক কাজ—করার সময় বিশেষ ধরনের হেডসেট ব্যবহার করছেন। হেডসেটটি শুধু ভিডিও ধারণই করে না, একই সঙ্গে ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেতও রেকর্ড করে।

এই প্রকল্পে এনকোর্ডের সহযোগী জার্মানির স্নায়ুবিজ্ঞানভিত্তিক স্টার্টআপ জ্যান্ডার ল্যাবস (Zander Labs)। প্রতিষ্ঠানটির গবেষকদের বিশ্বাস, মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে কোনো কাজের সময় মনোযোগ, ভুল করার সম্ভাবনা, উদ্দেশ্য কিংবা বিস্ময়ের মতো মানসিক অবস্থা শনাক্ত করা সম্ভব। এসব তথ্য ভবিষ্যতের রোবটকে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।

বর্তমানে প্রকল্পটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। গবেষকরা প্রথমে ব্রেইন ওয়েভ-সংবলিত একটি ডেটাসেট তৈরি করবেন। পরে সেটি বিভিন্ন রোবটিক্স কোম্পানির এআই মডেলে প্রয়োগ করে দেখা হবে, এতে রোবটের কর্মক্ষমতা বাস্তবেই উন্নত হয় কি না।

এনকোর্ডের রোবট লার্নিং বিভাগের প্রধান ভিনীত ভেলমুরুগান বলেন, আধুনিক রোবট তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংকট এখন ডেটা। ভাষাভিত্তিক এআই মডেলের মতো ইন্টারনেট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও রোবটের জন্য বাস্তব পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হয় আলাদাভাবে। ফলে এই ডেটা সংগ্রহ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।

তার মতে, শুধু ভিডিও দেখে রোবটকে প্রশিক্ষণ দিলে বাস্তব পরিস্থিতির সূক্ষ্ম বিষয়গুলো শেখানো যায় না। এজন্য মানুষের চোখে দেখা দৃশ্য, হাতের নড়াচড়া, পেশির সংকেত এবং মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া—সবকিছু একসঙ্গে ধারণ করে প্রশিক্ষণ ডেটা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

গবেষণাগারে রোবটকে নানা ধরনের বাস্তব কাজ শেখানো হচ্ছে। প্রশিক্ষকেরা বিশেষ রোবোটিক বাহু ব্যবহার করে কফি কাপ ভরা, পোকার চিপ সাজানো, ইথারনেট কেবল সংযুক্ত করা, ফুলদানি সরানো কিংবা ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার মতো কাজ করছেন। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ধাপ বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে এআই মডেল শুধু কাজটি দেখেই না, বরং তার উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়াও বুঝতে পারে।

এনকোর্ড আরও একটি নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যেখানে বাহুতে লাগানো সেন্সরের মাধ্যমে পেশির বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করা হয়। গবেষকদের ধারণা, এতে মানুষের হাতের ত্রিমাত্রিক নড়াচড়ার আরও নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে, যা ভবিষ্যতের রোবটকে সূক্ষ্ম কাজ শেখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ ধরনের উচ্চমানের ডেটা সাধারণ ভিডিওভিত্তিক ডেটার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। যদিও এমন ডেটা তৈরি করতে খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, তবু উন্নতমানের রোবট তৈরির জন্য এটিকে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবেই দেখছেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের মানবসদৃশ রোবট শুধু শক্তিশালী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করবে না; বরং মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়ার গভীর বিশ্লেষণই হবে তাদের শেখার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই এখন নতুন প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ডেটা তৈরির এক নতুন যুগের সূচনা করতে চাইছে এনকোর্ড।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন