Monday, September 14, 2026

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি বিস্তার ও সহিংসতা রেকর্ড উচ্চতায়


ছবিঃ এক ব্যক্তি ইসরায়েলের বিতর্কিত বিভাজন প্রাচীরে ফিলিস্তিনি পতাকা স্থাপন করছেন; পটভূমিতে ইসরায়েলি বসতি দেখা যাচ্ছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা /আম্মার আওয়াদ/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ইসরায়েলি বসতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব বসতি ও নতুন আউটপোস্টের বিস্তার আরও দ্রুত হয়েছে।

ইসরায়েলের দখলে থাকা পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে গড়ে ওঠা এসব বসতিতে মূলত ইহুদি ইসরায়েলিরা বসবাস করেন। অনেক বসতি দেখতে সাধারণ আবাসিক এলাকার মতো হলেও পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত এসব স্থাপনা আশপাশের ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলোর ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছে।

ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন পিস নাউ-এর তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অন্তত ১৪৮টি এবং পূর্ব জেরুজালেমে আরও ১৫টি বসতি রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৬৩টি বসতিতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ ইসরায়েলি বসবাস করছেন, যা দেশটির মোট ইহুদি জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর গত ছয় দশকে বসতি সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি আউটপোস্ট থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম এখন সড়ক, মহাসড়ক ও বড় আবাসিক এলাকার বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।

২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এসব বসতিতে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৭০০ ইসরায়েলি বসবাস করছিলেন। এর মধ্যে পশ্চিম তীরে ৫ লাখ ১১ হাজার ১০০ এবং পূর্ব জেরুজালেমে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৬০০ জন। এর বাইরে অনুমোদনহীন আউটপোস্টের সংখ্যাও ৪০০ ছাড়িয়েছে। এসব আউটপোস্টের অনেকগুলো পরবর্তীতে অনুমোদিত বসতির সঙ্গে যুক্ত বা বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের অধীনে কোনো দখলদার রাষ্ট্রের পক্ষে দখল করা ভূখণ্ডে নিজ দেশের জনসংখ্যা স্থানান্তরের সুযোগ নেই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেওয়া আইসিজের পরামর্শমূলক মতামতেও ইসরায়েলের বসতি নীতি ও দখলদারিত্বের বিভিন্ন দিককে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ইসরায়েলি আইনের অধীনে অবশ্য এসব বসতির অনেকগুলোই সরকারের অনুমোদন, পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে আউটপোস্টগুলো সাধারণত আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ছোট আকারে গড়ে ওঠে। পরে এগুলোর অনেকগুলোকে বৈধতা দেওয়া অথবা বিদ্যমান বসতির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি ইসরায়েলি বসতি বড় শহরের আকার নিয়েছে। সেখানে মেয়র কার্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান, চিকিৎসাকেন্দ্র এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় বসতিগুলোর মধ্যে মোদিইন ইলিতের জনসংখ্যা ৮৯ হাজার ৩০১। এরপর রয়েছে বেইতার ইলিত, যেখানে বাস করেন ৭০ হাজার ২৫১ জন। পূর্ব জেরুজালেমের পিসগাত জিভে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৪৮ হাজার ৪১৯।

এসব বসতিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করতে নির্মিত সড়কব্যবস্থার একটি বড় অংশ ফিলিস্তিনিদের চলাচলের জন্য সীমিত বা নিষিদ্ধ। অনেক বাইপাস সড়ক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে নির্মিত হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর যোগাযোগব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত এবং অঞ্চলগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

এর একটি বড় উদাহরণ পূর্ব জেরুজালেমের পূর্বদিকে অবস্থিত ‘ই-১’ এলাকা। এখানে মালে আদুমিম বসতির সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পূর্ব জেরুজালেম পশ্চিম তীরের অন্যান্য অংশ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ই-১ প্রকল্পে ৩ হাজারের বেশি নতুন আবাসন নির্মাণের অনুমোদন দেন। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে স্থগিত থাকা এ পরিকল্পনা পুনরায় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।

প্রায় ৩০টি সরকার ও ইউরোপীয় কমিশন এ উদ্যোগকে অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে।

বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ফিলিস্তিনিদের হতাহত করা বা সম্পদের ক্ষতি ঘটানো বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা ছিল ৮৫২টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৬-এ।

অর্থাৎ ওই বছরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচটি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময় পর্যন্ত এ ধরনের হামলার সংখ্যা আরও বেড়েছে। ওই সময়ের মধ্যে মোট ৫ হাজার ১৩১টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৪১৮টি হামলার তথ্য রেকর্ড করেছে ওসিএইচএ। বছর এখনও শেষ না হওয়ায় এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আলাদা দুটি প্রবণতা হলেও বাস্তবে দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একদিকে সরকারি পরিকল্পনা ও অনুমোদনের মাধ্যমে পুরোনো বসতিগুলো সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে অনুমোদনহীন নতুন আউটপোস্ট ও স্থানীয় পর্যায়ের সহিংসতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সাম্প্রতিক কিছু হামলাকে ‘পোগ্রোম’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অতীতে হুয়ারার মতো হামলার পর ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারাও এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন।

ফলে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, নতুন আউটপোস্ট স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা এই তিনটি প্রবণতা একসঙ্গে ওই অঞ্চলের ভূমি ও জনসংখ্যার কাঠামোকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন