- ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত সশস্ত্র বাহিনী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে হুতিদের কাছ থেকে কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করে পশ্চিমাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সোমবার তাইজ থেকে আল জাজিরা আরবির প্রতিবেদক ইয়াসের হাসান জানান, রোববার হুতিদের একটি বড় ধরনের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার পর সরকারি বাহিনী পশ্চিম তাইজে বেশ কিছু এলাকায় অগ্রসর হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর একটি সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, স্থল অভিযানের পাশাপাশি হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম উপকূলের মোখা, ধুবাব ও আশপাশের এলাকায় হুতিদের অবস্থান ও সমাবেশ লক্ষ্য করে বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে হুতিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। সোমবার এক বিবৃতিতে আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত সংগঠনটি জানায়, কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে।
হুতিদের দাবি, সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকায় কিং খালিদ বিমানঘাঁটির সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো হামলার লক্ষ্য ছিল। এর মধ্যে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার স্থাপনা, রানওয়ে, গোলাবারুদের গুদামসহ বিভিন্ন স্থাপনার কথা উল্লেখ করেছে তারা।
হুতিদের ভাষ্য, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ব্যাপক বিমান হামলার জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। গত পাঁচ দিনে ইয়েমেনজুড়ে ৩০০টির বেশি বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
তবে হুতিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববার সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ আবহা শহর এবং খামিস মুশাইত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই ওই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
ইয়েমেনে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের বড় ধরনের লড়াই ২০২২ সালের পর অনেকটা স্তিমিত ছিল। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় পরিসরের সংঘাত থামাতে একটি যুদ্ধবিরতিও কার্যকর ছিল। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সেই স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হুতিদের সৌদি আরবকে ঘিরে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা এবং লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার পর সংঘাত দ্রুত আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা, এমনকি তেল অবকাঠামোও হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
গত সপ্তাহে হুতিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এর ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাব আল-মান্দাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ, সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৮ শতাংশ এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ফলে এই নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে দক্ষিণ লোহিত সাগরের আরও কয়েকটি কৌশলগত দ্বীপে হুতিদের অবস্থান শক্ত করার খবর পাওয়া গেছে। ইয়েমেনি সরকারি ও হুতি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপে হুতি যোদ্ধাদের মোতায়েন করা হয়েছে।
দ্বীপ দুটি বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। কৌশলগত অবস্থানের কারণে এসব দ্বীপে হুতিদের উপস্থিতি লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
সংঘাতের সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতিও অবনতির দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর লড়াইয়ে ইয়েমেনে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বাস্তুচ্যুতদের একটি অংশ নিরাপত্তার জন্য দেশ ছেড়েও পালাচ্ছেন। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি ইয়েমেনি ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ জিবুতিতে পৌঁছেছেন।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।