Monday, September 14, 2026

দশকের সংঘাত পেরিয়ে প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন, ভোট দিচ্ছে ফিলিপাইনের বাংসামোরো


ছবিঃ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দক্ষিণ ফিলিপাইনের লানাও দেল সুর প্রদেশের মারান্তাও শহরে মহাসড়কে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ফ্রয়লান গালার্দো/এপি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

দীর্ঘ কয়েক দশকের বিদ্রোহ, সংঘাত ও সহিংসতার পর স্বশাসনের পথে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ পেরোচ্ছে ফিলিপাইনের মুসলিম-অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চল বাংসামোরো। ২০১৯ সালে বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো সেখানে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বাংসামোরো অটোনোমাস রিজিয়ন ইন মুসলিম মিনদানাও (বিএআরএমএম) অঞ্চলে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। নির্বাচনে ২৩ লাখের বেশি ভোটার তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন স্থগিত থাকার পর এবার ভোটার উপস্থিতি ৮০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে ৮০ সদস্যের আঞ্চলিক পার্লামেন্ট গঠিত হবে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের জন্য ৪০টি, বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের জন্য ৩২টি এবং বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের জন্য আটটি আসন নির্ধারিত রয়েছে।

নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনেই অঞ্চলটির নির্বাহী শাখার প্রধান মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু আইনসভা গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংসামোরোর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও স্বশাসনের কাঠামো নির্ধারণেও এর বড় ভূমিকা রয়েছে।

তবে ঐতিহাসিক এই নির্বাচন শুরুর আগের দিনই সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান জর্জ গার্সিয়া জানিয়েছেন, রোববার রাতে কোটাবাতো সিটিতে গুলির ঘটনায় তিনজন নিহত এবং আরও ১৫ জন আহত হওয়ার পর এলাকাটি কমিশনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।

শহরটির পৃথক কয়েকটি ঘটনায় আরও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। একটি ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি বিস্ফোরক বহনকারী ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অন্য একটি ঘটনায় গুলি চালানো হলেও কেউ আহত হয়নি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।

এদিকে বাসিলান প্রদেশের মালুসো শহরেও ভোটগ্রহণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ৬৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৬টিতে আগে থেকেই চিহ্নিত করা ব্যালট পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ক্ষতিগ্রস্ত কেন্দ্রগুলোতে নতুন ব্যালট ছাপানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান গার্সিয়া সহিংসতা সৃষ্টি, ভোট কেনাবেচা বা নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

বাংসামোরোর নির্বাচনকে কয়েক প্রজন্মের সংগ্রামের ফল হিসেবে দেখছে অঞ্চলটির মানুষ। দীর্ঘদিনের সংঘাত, ভূমি হারানো, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করছেন ভোটাররা।

আল জাজিরার প্রতিবেদক বার্নাবি লো মারাউই থেকে জানিয়েছেন, অনেক ভোটার বলছেন—এই নির্বাচন অনেক আগেই হওয়া প্রয়োজন ছিল। তাঁদের প্রত্যাশা, নির্বাচিত নেতারা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।

তবে নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। অঞ্চলটিতে অতীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ঘটনা ব্যাপক ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হলেও ভোটের আগে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংসামোরো পার্লামেন্ট নির্বাচন ২০১৯ সাল থেকে চলা অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচিত আঞ্চলিক সরকারের পথ তৈরি করছে। এতদিন অঞ্চলটি বাংসামোরো ট্রানজিশন অথরিটির (বিটিএ) অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছিল।

২০১৪ সালের একটি শান্তিচুক্তির ভিত্তিতে বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) সাবেক বিদ্রোহীরা অস্ত্র ত্যাগ ও নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে সরে আসে।

ফিলিপাইনের মতো প্রধানত ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলিম-অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো তৈরিই ছিল ওই শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম লক্ষ্য।

১৯৭০-এর দশক থেকে চলা সংঘাতে এ অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একসময় বিভিন্ন কট্টরপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বাংসামোরোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।


তবে এবারের নির্বাচন সেই শান্তির প্রক্রিয়াকে আরও স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি দিতে পারবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ভোটারদের প্রত্যাশা, নির্বাচিত পার্লামেন্ট ও নতুন আঞ্চলিক সরকার উন্নয়ন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন