Tuesday, July 21, 2026

পাঁচ মাস পর শরিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠক, সমন্বয় জোরদারে দিলেন নিয়মিত সংলাপের আশ্বাস


ফাইল ছবিঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে সরকার পরিচালনা, রাজনৈতিক সমন্বয়, রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে শরিক নেতাদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার ও জোটসঙ্গীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা, নীতিগত সমন্বয় বাড়ানো এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি নিয়ে মতবিনিময়ের উদ্দেশ্যেই এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বিশেষ করে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সরকারে শরিকদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে যে আলোচনা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে বৈঠকটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈঠকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, আন্দালিভ রহমান পার্থ, সাইফুল হক, রফিকুল ইসলাম বাবলু, শাহাদাত হোসেন সেলিম, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

তবে শরিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বৈঠকে অংশ নেয়নি। দলটির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ জানান, জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের মতো মৌলিক রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক বৈঠকে অংশ নেওয়া দলটির নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে তারা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে।

অন্যদিকে আমন্ত্রণ পেয়েও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বৈঠকে অংশ নেয়নি। দলটির মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী জানান, এটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। তবে সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

বৈঠকে কয়েকজন শরিক নেতা সরকার পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক সমন্বয় আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে শরিকদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি।

সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন, স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের সময় শরিকদের সঙ্গে আলোচনা না হওয়ায় বিএনপি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে বলেও মত দেন কয়েকজন নেতা। পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বৈঠকে একজন নেতা আমন্ত্রণ জানানোর প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট মোকাবিলাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। ফলে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, সরকার একটি কঠিন বাস্তবতা থেকে কাজ শুরু করেছে এবং ভেঙে পড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষিঋণ, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, ধর্মীয় নেতা ও ক্রীড়াবিদদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমন্বয় আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন।

আলোচনার শেষ দিকে পরিবেশ কিছুটা হালকা করতে এক শরিক নেতা রসিকতা করে প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই নৈশভোজটি ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’ কি না। জবাবে হাসতে হাসতেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘না, এটি ওয়েলকাম ডিনার। উপস্থিত নেতাদের মধ্যে তখন হাস্যরসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার গঠনের পর এটি ছিল শরিকদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তিনি জানান, দীর্ঘ আন্দোলন, মামলা, কারাবরণ, গুম ও নির্যাতনের স্মৃতি বৈঠকে উঠে এসেছে। শরিক দলগুলোর নেতারা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে এই প্রথম উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠক ভবিষ্যতের জোট রাজনীতি, নীতিনির্ধারণ এবং সমন্বয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন