- ২১ জুলাই, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা বহুল আলোচিত কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমঝোতা চুক্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। এর ফলে মামলার আওতাভুক্ত লেখক ও প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পথ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হলো।
সোমবার (স্থানীয় সময়) ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টের যুক্তরাষ্ট্রের জেলা আদালতের বিচারক আরাসেলি মার্টিনেজ-ওলগুইন এই সমঝোতা অনুমোদন করেন। এর আগে একই আদালতের বিচারক উইলিয়াম অলসাপ মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে রায় দিয়েছিলেন। অবসরে যাওয়ার আগে তিনি সমঝোতার প্রাথমিক অনুমোদনও দিয়েছিলেন।
আদালতের অনুমোদিত চুক্তি অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ লাখ কপিরাইটকৃত বই বা প্রকাশনার জন্য প্রতিটি কাজের বিপরীতে তিন হাজার ডলার করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এই অর্থ সংশ্লিষ্ট লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যে তাদের অধিকার অনুযায়ী বণ্টন করা হবে। কপিরাইট-সংক্রান্ত মার্কিন ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় আর্থিক সমঝোতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হলেও অনেক লেখক ও সৃজনশীল ব্যক্তির কাছে এটি পুরোপুরি সন্তোষজনক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কারণ, মামলার মূল আইনি প্রশ্ন—কপিরাইটকৃত বই ব্যবহার করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া বৈধ কি না—সে বিষয়ে আদালতের অবস্থান প্রযুক্তি শিল্পের পক্ষেই গেছে।
বিচারক উইলিয়াম অলসাপ তার রায়ে বলেন, কপিরাইটকৃত বইয়ের তথ্য ব্যবহার করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট আইনের ‘ফেয়ার ইউজ’ নীতির আওতায় পড়তে পারে। প্রযুক্তি খাতের জন্য এই ব্যাখ্যাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছেন, অ্যানথ্রপিক যেভাবে কিছু বই সংগ্রহ করেছে, সেটি আইনসম্মত ছিল না। তদন্তে উঠে আসে, প্রতিষ্ঠানটি একদিকে বৈধভাবে কেনা ও স্ক্যান করা বই ব্যবহার করলেও অন্যদিকে Library Genesis এবং Pirate Library Mirror–এর মতো পাইরেটেড ওয়েবসাইট থেকে বিপুলসংখ্যক বই ডাউনলোড করে নিজেদের প্রশিক্ষণভান্ডারে যুক্ত করেছিল। আদালতের মতে, এই পদ্ধতিতে বই সংগ্রহ করা কপিরাইট আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এই অভিযোগের বিচার জুরি ট্রায়ালে গড়ানোর আগেই অ্যানথ্রপিক সমঝোতার পথে হাঁটে। বিশ্লেষকদের ধারণা, জুরি বোর্ডের রায়ে আরও বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ গুনতে হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই প্রতিষ্ঠানটি আপসের সিদ্ধান্ত নেয়।
যদিও এই মামলার নিষ্পত্তি হলো, তবু এটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কপিরাইট আইন নিয়ে চূড়ান্ত নজির তৈরি করছে না। কারণ, মামলাটি আপিল আদালতে যায়নি। ফলে অন্যান্য আদালত একই ধরনের মামলায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ রাখছে।
বর্তমানে গুগল, মেটা, ওপেনএআই এবং মিডজার্নিসহ একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে পৃথক মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্নও একই—লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ছাড়া কপিরাইটকৃত বই, নিবন্ধ বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজ ব্যবহার করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া আইনসম্মত কি না।
সম্প্রতি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হ্যাশেট, সেনগেজ, এলসেভিয়ার, লেখক স্কট টুরো এবং এস.সি.আর.আই.বি.ই.–সহ একদল লেখক ও প্রকাশক গুগলের বিরুদ্ধে নতুন একটি ক্লাস অ্যাকশন মামলা দায়ের করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি অনুমতি ছাড়াই কপিরাইটকৃত বই ও প্রকাশনা ব্যবহার করে জেমিনি এআই প্ল্যাটফর্মকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
প্রযুক্তি ও কপিরাইট বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রপিকের এই মামলার নিষ্পত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কপিরাইট আইনের সংঘাত এখনো শেষ হয়নি। বরং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালত কিংবা নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা আসতে পারে।