- ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কক্সবাজার। সীমান্ত ও সমুদ্রপথে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত এসব চালান আটক হচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা প্রায় ছয় হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এই বিপুলসংখ্যক মামলার চাপ কমিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার লক্ষ্যে কক্সবাজারে যাত্রা শুরু করেছে তিনটি ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’। নতুন ট্রাইব্যুনালগুলোতে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের মামলাগুলোর বিচার করা হবে।
তবে নতুন ট্রাইব্যুনালের জন্য পৃথক এজলাস ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও প্রস্তুত না হওয়ায় আপাতত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নিয়ন্ত্রণাধীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৩, ৪ ও ৫-এর শাখায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
কক্সবাজার বিচার বিভাগের জেলা নাজির এম. বেদারুল আলম জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা-৪ থেকে জারি করা গেজেটের মাধ্যমে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট ২২টি মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি ট্রাইব্যুনালের বিচারিক অধিক্ষেত্রও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
গেজেট অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল-১-এর অধিক্ষেত্রে রয়েছে টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলা। ট্রাইব্যুনাল-২-এর আওতায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও ঈদগাঁও এবং ট্রাইব্যুনাল-৩-এর আওতায় রাখা হয়েছে রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা।
জেলা নাজির বলেন, গেজেট প্রকাশের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে নিয়মিত আদালতে বিচারাধীন ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে দায়ের করা পাঁচ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের মামলাগুলো নতুন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করার নির্দেশনা রয়েছে। মামলাগুলো যে পর্যায়ে রয়েছে, সেখান থেকেই ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪৪(ক)-এর ২ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকরা এসব ট্রাইব্যুনালের বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৩-এর অধীনে ট্রাইব্যুনাল-১, আদালত-৪-এর অধীনে ট্রাইব্যুনাল-২ এবং আদালত-৫-এর অধীনে ট্রাইব্যুনাল-৩-এর কার্যক্রম চলছে।
নতুন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরুর দিনেই কক্সবাজারে মাদকের দুটি বড় চালান জব্দের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে এক অভিযানে কক্সবাজার সরকারি কলেজের নারী হোস্টেল থেকে ২০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, রোববার সন্ধ্যায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় দোলনচাঁপা ছাত্রীনিবাসে অভিযান চালানো হয়। এ সময় শরিফা আক্তার নামে এক শিক্ষার্থীর খাটের নিচে রাখা ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে আটক করা হয়।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীর এক নিকটাত্মীয় ইয়াবার চালানটি তার কাছে পাঠিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আটক শরিফা আক্তার কলেজটির গণিত বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।
এর আগে রোববার ভোরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের রামু উপজেলার খুনিয়াপালংয়ের প্যাঁচারদ্বীপ রেজুখাল চেকপোস্ট এলাকায় আরেকটি অভিযান চালায় বিজিবি। একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালিয়ে ৮৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করা হয়।
কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায়ও সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়েছে।
একই দিনে পৃথক দুটি অভিযানে ১ লাখ ৯ হাজার ৪০০ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা কক্সবাজারে মাদক চোরাচালানের ব্যাপকতার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। পাশাপাশি প্রতিটি আটকের ঘটনায় মামলা হওয়ায় আদালতে মাদক মামলার সংখ্যাও বাড়ছে।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী বাপ্পী শর্মা বলেন, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মাদক মামলার বিচার করার সুযোগ থাকলেও এতদিন তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি। এখন পৃথক ট্রাইব্যুনাল চালু হওয়ায় মাদক মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান বলেন, মাদক চোরাচালানের প্রবণতা বেশি এমন এলাকায় পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন ইতিবাচক উদ্যোগ। মামলার দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তি হলে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি, সাবেক পিপি ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, মাদকপাচার নিয়ন্ত্রণে পৃথক ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যাপ্ত বিচারক, জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করে ট্রাইব্যুনালগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা গেলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মাদক মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজারে মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নতুন তিন ট্রাইব্যুনাল কতটা দ্রুত মামলার জট কমাতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।