Tuesday, October 27, 2026

জম্বিরাও শেখে, বদলায় কৌশল: ইয়ন সাং-হোর নতুন ছবি ‘কলোনি’


ছবিঃ ‘কলোনি’র দৃশ্য (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN

জম্বি সিনেমায় ভয়, রক্তপাত আর প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া লড়াই নতুন কিছু নয়। তবে সংক্রমিত মানুষেরা যদি শুধু শিকার না করে, বরং একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিজেদের আক্রমণের কৌশলও বদলে নিতে পারে, তাহলে সেই লড়াইয়ের চিত্র কেমন হবে? দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা ইয়ন সাং-হোর নতুন সিনেমা ‘কলোনি’তে উঠে এসেছে এমনই এক ব্যতিক্রমী ভাবনা।

‘ট্রেন টু বুসান’ দিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই নির্মাতা আবারও জম্বি ঘরানায় হাজির হয়েছেন দ্রুতগতির অ্যাকশন, রক্তাক্ত সংঘর্ষ ও আতঙ্কে ভরা এক গল্প নিয়ে। ছবিটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সংক্রমিতদের দলগত বুদ্ধিমত্তা। তবে অভিনব ধারণা ও চোখধাঁধানো অ্যাকশন থাকা সত্ত্বেও গল্পের গভীরতা এবং চরিত্রগুলোর বিকাশে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।

‘কলোনি’র গল্প শুরু হয় সিউলের একটি বহুতল ভবনে। সেখানে একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন চলার সময় ছড়িয়ে পড়ে ভয়ংকর সংক্রমণ। প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় এমন এক ছত্রাকের কথা উঠে আসে, যা তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে এবং মৃত কোষকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা রাখে।

প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মী সিও ইয়ং-চল প্রতিশোধ নিতে এসে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। তার কর্মকাণ্ডের পর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা অস্বাভাবিক ও হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হয়। কামড় ও দেহনিঃসৃত তরলের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনটি পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে।

এ অবস্থায় সেখানে আটকে পড়া মানুষদের নিজেদের বাঁচার পথ খুঁজতে হয়। বিজ্ঞানী কওন সে-জং, তাঁর সাবেক স্বামী হান কিয়ো-সং, নিরাপত্তাকর্মী হিউন-সক এবং তাঁর বোন হিউন-হিসহ কয়েকজন মানুষ একদিকে সংক্রমিতদের মোকাবিলা করেন, অন্যদিকে নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধ ও অবিশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করেন।

বাইরে থেকে উদ্ধার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। ফলে প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় কাকে বিশ্বাস করবেন, কোথায় আশ্রয় নেবেন এবং কখন পালানোর চেষ্টা করবেন।

ছবিটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এখানে সংক্রমিতরা প্রচলিত জম্বি সিনেমার মতো কেবল ক্ষুধার তাড়নায় মানুষকে ধাওয়া করে না। তারা অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকেও শেখে। কোনো একটি কৌশল সম্পর্কে ধারণা তৈরি হলে সেই তথ্য অন্য সংক্রমিতদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

এ কারণে মানুষ একবার কোনো ফাঁদ তৈরি করে সফল হলেও একই কৌশল বারবার কাজে লাগাতে পারে না। সংক্রমিতরা পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের আচরণ বদলে নেয়। ফলে তাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের প্রতিনিয়ত নতুন পরিকল্পনা করতে হয়।

ছবির এই ধারণা জম্বিদের আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। কারণ, এখানে বিপদ শুধু আক্রান্তদের সংখ্যা নয়; বরং তাদের সম্মিলিতভাবে শেখার এবং নিজেদের কৌশল বদলে নেওয়ার ক্ষমতা।

সংক্রমিতদের শরীরী ভাষা ও চলাফেরাও ছবির ভয়ের পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে শরীর বাঁকানো, মেঝের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দেওয়া কিংবা দলবদ্ধভাবে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যগুলো পর্দায় অস্বস্তিকর আবহ তৈরি করে। তাদের সম্মিলিত নড়াচড়া কখনো নৃত্যের মতো, আবার কখনো দুঃস্বপ্নের দৃশ্যের মতো মনে হয়।

বহুতল ভবনের বিপণিবিতান, অফিস, লিফট, সরু করিডর ও অন্ধকার কক্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ছবির বেশির ভাগ উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য। কোথাও সংক্রমিতদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা, কোথাও লুকিয়ে থাকার লড়াই, আবার কোথাও বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে নতুন বিপদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা দর্শককে ব্যস্ত রাখে।

ক্যামেরার ব্যবহার, আলো-ছায়ার বিন্যাস এবং দ্রুত সম্পাদনা অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে আরও গতিশীল করেছে। বিশেষ করে সংক্রমিতদের সম্মিলিত আক্রমণের মুহূর্তগুলোতে তাদের অস্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়া ভয় বাড়িয়ে দেয়।

বিপণিবিতানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্যগুলো জম্বি ঘরানার পুরোনো কিছু সিনেমার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। তবে ‘কলোনি’তে দলগতভাবে শেখার ক্ষমতা সংযোজন করায় পরিচিত পরিবেশেও নতুন ধরনের বিপদের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

জম্বিদের আক্রমণ ছবির মূল চালিকাশক্তি হলেও মানুষের আচরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপদের মুখে সবাই যে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, তা নয়। কেউ নিজের নিরাপত্তাকে সবার ওপরে রাখে, কেউ আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, আবার কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্যদের বিপদে ফেলে।

এই জায়গায় পরিচালক ইয়ন সাং-হো মানুষের নৈতিকতা ও স্বার্থপরতার দিকটি সামনে এনেছেন। সংকটের সময় অন্যকে বাঁচাতে নিজের ঝুঁকি নেওয়া কিংবা নিজের প্রাণ রক্ষায় অন্যকে পরিত্যাগ করার মতো সিদ্ধান্তগুলো গল্পে বারবার ফিরে আসে।

সিও ইয়ং-চলের চরিত্রে এই ভাবনার আরও অন্ধকার দিক দেখা যায়। তার ধারণা, মানুষের স্বতন্ত্র চিন্তাভাবনা থেকেই অনেক সংঘাতের জন্ম। বিপরীতে সংক্রমিতরা যেহেতু নিজেদের মধ্যে তথ্য ভাগ করে নিতে পারে, তাই তাদের সে মানুষের চেয়ে উন্নত কোনো ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে শুরু করে।

এই ধারণার মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা, দলগত নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু সিনেমাটি সেই ভাবনাগুলোকে খুব বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেনি। অ্যাকশন ও নতুন বিপদের দিকে এগোতে গিয়ে গল্পের দার্শনিক দিকটি অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়।

বিজ্ঞানী কওন সে-জং চরিত্রে জুন জি-হিউন বুদ্ধিদীপ্ত ও স্পষ্টবাদী এক নারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। বিপদের মধ্যে তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টি চরিত্রটিকে আলাদা করেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ চরিত্রের চেয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে বেশি মনে হয়।

সিও ইয়ং-চল চরিত্রে কু কিয়ো-হোয়ানও পর্দায় নজর কাড়েন। তাঁর প্রতিশোধস্পৃহা ও বিপজ্জনক মানসিকতা গল্পের সংকটকে জটিল করে তোলে। কিন্তু তাঁর ক্ষোভের পেছনের কারণ জানা গেলেও চরিত্রটির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আরও বিস্তৃত হতে পারত।

অন্যদিকে হিউন-সক ও তাঁর বোন হিউন-হির সম্পর্ক গল্পে মানবিক আবেগের জায়গা তৈরি করেছে। বিপদের মধ্যে তাঁদের পারস্পরিক নির্ভরতা দর্শককে চরিত্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়। তবে অন্যান্য চরিত্রের ব্যক্তিগত ইতিহাস ও আবেগ যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়ায় তাদের অনেককেই গল্পের প্রয়োজনে ব্যবহৃত মনে হয়।

ছবিটির বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অভিনব ধারণার তুলনায় গল্পের বিস্তার কম। সংক্রমিতদের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তা, মানুষের স্বাধীন চিন্তা এবং দলগত নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল। কিন্তু বারবার নতুন বিপদ তৈরি হওয়া এবং সেখান থেকে পালানোর চেষ্টার মধ্যে গল্পটি অনেক সময় একই ধরনের কাঠামোয় ফিরে যায়।

দুই ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের সিনেমাটিতে সব দৃশ্য সমান উত্তেজনা ধরে রাখতে পারেনি। কিছু চরিত্রের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক মনে হয়, আবার কিছু ঘটনা আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা যেত। ফলে দর্শককে ভয় দেখানো ও বিনোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হলেও গল্পের আবেগ ও গভীরতায় ছবিটি প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না।

‘কলোনি’ জম্বি ঘরানায় সম্পূর্ণ নতুন কোনো দিগন্ত খুলে দেয়নি। তবে সংক্রমিতদের দলগতভাবে শেখার ক্ষমতা, অস্বাভাবিক শারীরিক অভিনয় এবং দ্রুতগতির অ্যাকশন ছবিটিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

যাঁরা রক্তাক্ত সংঘর্ষ, টানটান উত্তেজনা ও প্রচলিত জম্বি সিনেমার বাইরে কিছু নতুন দেখতে চান, তাঁদের কাছে ছবিটি উপভোগ্য হতে পারে। তবে শক্তিশালী চরিত্র নির্মাণ, গভীর গল্প এবং দার্শনিক অনুসন্ধান যাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের কাছে ‘কলোনি’ কিছুটা অপূর্ণ মনে হতে পারে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন