Tuesday, October 27, 2026

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইসরায়েলের নির্বাচন, ফিলিস্তিন নীতি নিয়ে প্রশ্ন


ছবিঃ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৭ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের তেল আবিবে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতাকালে মঞ্চে দাঁড়িয়ে দুই হাত ও হাতের তালু খোলা অবস্থায় উঁচিয়ে ধরেন। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /এরিক মারমোর/গেটি ইমেজেস)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইসরায়েলে মঙ্গলবার শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত জাতীয় নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দেশটির নিরাপত্তানীতি এবং সরকারের গতিপথ নির্ধারণে এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে এবারের ভোট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবারও ক্ষমতায় থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলো রয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর বিরোধীরা নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরলেও তাদের বড় অংশের অবস্থানও নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন নীতির ক্ষেত্রে ডানপন্থী ধারার কাছাকাছি।

নেতানিয়াহুর সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আইনি জটিলতাও রয়েছে। ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার চলছে, যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যর্থতার অভিযোগও নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ, বিচারব্যবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ এবং আরব-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার বিষয়ও নির্বাচনী বিতর্কে স্থান পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থার প্রভাব বৃদ্ধি শুধু নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক সরকারের সময় শুরু হয়নি। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার স্থবিরতা, ধারাবাহিক নিরাপত্তা সংকট এবং কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মধ্যপন্থী ও বামপন্থী শক্তির প্রভাব কমেছে।

২০১৮ সালে পাস হওয়া ‘নেশন-স্টেট আইন’ ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেয়। সমালোচকদের মতে, আইনটি ইসরায়েলে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অধিকার ও অবস্থানের মধ্যে বৈষম্যকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমালোচনা রয়েছে।

নেতানিয়াহুর সর্বশেষ সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমানোর পরিকল্পনা ঘিরে ২০২৩ সালে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। অতি-ডানপন্থী নেতা ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের মতো নেতারা সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে প্রথম পর্যায়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলি সমাজে ডানপন্থী মনোভাব জোরালো হওয়ায় নতুন সরকার এলেও সামগ্রিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে।

চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, এই নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েল কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন বজায় রাখবে কি না, অধিকৃত পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ কী হবে এসব প্রশ্নও নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

নির্বাচন ঘিরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তাপ থাকলেও ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় দলগুলোর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

গাজায় প্রাণহানি, পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধি এবং ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটছে। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও সামরিক অভিযান বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, দেশটির মূলধারার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ইহুদি আধিপত্যের ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত। তাঁর বক্তব্য, নেতানিয়াহুর বিরোধী হিসেবে পরিচিত নেতাদেরও প্রকৃত বামপন্থী বলা কঠিন, কারণ ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্নে তাদের অবস্থানের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের মৌলিক মিল রয়েছে।

সাবেক ইসরায়েলি সরকারি উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভিও মনে করেন, এবারের নির্বাচনকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পক্ষে বা বিপক্ষে গণভোট হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। তাঁর মতে, মূলধারার জায়নবাদী দলগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ে মৌলিক ঐকমত্য রয়েছে; পার্থক্য মূলত নীতি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। তবে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে সম্ভাব্য সরকার গঠনের জোটে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে নির্বাচনের ফলাফল নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা বা না-থাকার প্রশ্নের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অধিকৃত ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ককেও নতুন করে সামনে আনতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার গঠিত হলেও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিন নীতিতে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা এখনো অনিশ্চিত। নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি সরকার গঠনের সমীকরণ এবং জোটের অংশীদারদের অবস্থানই পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন