Tuesday, October 27, 2026

ট্রাম্পের আস্থায় পাকিস্তান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন


ছবিঃ প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা /হ্যান্ডআউট/সৌজন্যে: পাকিস্তান সরকার)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। একসময় ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েনে থাকা ইসলামাবাদ এখন বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা করছে। বিপরীতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও নানা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী এ নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানরা বড় ধরনের আসন হারালে ওয়াশিংটনের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নিউইয়র্কে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে দেখলে বিশ্বের অনেক দেশেরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি উঠে আসে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ইসলামাবাদের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় সংঘাত প্রশমনে পাকিস্তানের ভূমিকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ওয়াশিংটন ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোয় ইসলামাবাদের গুরুত্ব কমে যায়। আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ ছিল।

তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০২৫ সালের মার্চে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প কাবুল বিমানবন্দরের অ্যাবে গেট বিস্ফোরণ মামলার এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে পাকিস্তানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।

একই বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের তীব্র সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। তবে ভারত এই দাবি নাকচ করে জানায়, দুই দেশের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সংঘাত থামানো হয়েছিল।

এরপর পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানানো হয়। পাকিস্তানি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্কও কমানো হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পাকিস্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক ২৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ড্রোন খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি যোগাযোগও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিক তুলে ধরেছে। হোয়াইট হাউসে মুনিরের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। পাকিস্তান আবার ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার উদ্যোগ নেয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের ভূমিকা ওয়াশিংটনের কাছে দেশটির গুরুত্ব বাড়ানোর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান মধ্যস্থতা করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পর দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আয়োজনেও ইসলামাবাদ ভূমিকা রাখে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক নিয়ে অগ্রগতি হয়।

তবে আলোচনা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি। পরবর্তী আলোচনার জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা আগস্টের মাঝামাঝি শেষ হয়ে যায়। ২০ অক্টোবর ইরানে আবার সফর করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনির। কিন্তু সফরে নতুন কোনো সমঝোতা হয়নি।

ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবর ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় পাকিস্তান এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে বিশ্লেষক ইমরান খানের মূল্যায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক পরিচিতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়লেও সরাসরি অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা কতটা মিলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে আসন হারালে পাকিস্তানের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশ্লেষক ইমরান খানের মতে, ডেমোক্র্যাটরা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ন্যাটোর মতো প্রচলিত মিত্রজোটকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে ওয়াশিংটনের আগ্রহ বাড়তে পারে।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের জ্যেষ্ঠ ভিজিটিং ফেলো গ্রেস ওয়ারমেনবোলের মতে, নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও পূর্বাভাস দিতে পারে।

তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে, পাকিস্তানের গুরুত্ব কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে মধ্যস্থতার সক্ষমতা ইসলামাবাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই সম্পর্ক কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন