- ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ব্রাজিলের রাজনীতিতে আবারও ইতিহাস গড়লেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রায় চার দশকের মধ্যে দেশটির রাজনীতিতে নজিরবিহীন এক প্রত্যাবর্তনের স্বাক্ষর রাখলেন ৮০ বছর বয়সী এই নেতা। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
নির্বাচনে লুলা পেয়েছেন ৫১ শতাংশের বেশি ভোট। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, কারাবন্দি সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ৯৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
তবে এই জয় সহজ ছিল না। গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। লুলার পক্ষে ভোট পড়ে ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় ২২ লাখ ভোট। ফলে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন ঘিরে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা ছিল।
প্রথম দফার পরের তিন সপ্তাহে লুলা মূলত কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের ভোটারদের সমর্থন পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে প্রচার চালান তিনি। নির্বাচনের শেষ দিকে দুই প্রার্থীর জনসমর্থন প্রায় সমান দেখাচ্ছিল বিভিন্ন জনমত জরিপেও।
ভোট গণনার শুরুতে ফ্লাভিও এগিয়ে থাকলেও পরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফল আসতে শুরু করলে ব্যবধান ঘুরে যায়। ঐতিহাসিকভাবেই ব্রাজিলের এই অঞ্চলে লুলা ও তাঁর দল ওয়ার্কার্স পার্টির শক্তিশালী জনসমর্থন রয়েছে। বিপরীতে দেশটির দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বলসোনারো পরিবারের উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।
নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় ভোট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই প্রার্থীর পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর আবেদন আসে। লুলার শিবিরের অভিযোগ ছিল, কয়েকটি শহরে গণপরিবহন কমিয়ে দেওয়ায় নিম্ন আয়ের ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে অসুবিধা হয়েছে। অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভোটারদের সুবিধার্থে অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল বলসোনারোর প্রচারশিবির।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিন ভোটগ্রহণ আরও দুই ঘণ্টা চালু রাখার নির্দেশ দেন। এতে ভোট দেওয়ার শেষ সময় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে কিছু কেন্দ্রে এর আগেই ভোটগ্রহণ শেষ করে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কোন কেন্দ্রে ভোট দেওয়া যাবে, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সময় বাড়ানোর পরও কিছু ভোটার ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ ওঠে।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ফ্লাভিও বলসোনারো ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, শেষ মুহূর্তে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে। তিনি ফল বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন এবং বিচারপতি জানিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
ভোটের দিন গণপরিবহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং সেবা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে ব্রাজিলের পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে তদন্ত করছে দেশটির ফেডারেল পুলিশ। সালভাদর শহরে গণপরিবহন কমানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে আদালত নগরীর পরিবহনবিষয়ক সচিবকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লুলার সমর্থকেরা এসব ঘটনাকে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বলসোনারোর শিবির ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ব্রাজিলের রাজনীতিতে বিচার বিভাগ ও ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যকার টানাপোড়েনও এই নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের আপত্তি রয়েছে। ফ্লাভিওও দেশটির বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লুলার জয়ের পেছনে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধিও ভূমিকা রেখে থাকতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা। জরিপ প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাসইনটেলের প্রধান আন্দ্রেই রোমান ভোটদানে অনাগ্রহী মানুষের সংখ্যা কমে আসাকে সম্ভাব্য একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গত ৪ অক্টোবর প্রথম দফার নির্বাচনে প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ভোটার ভোট দেননি। ব্রাজিলে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও ওই দফায় ভোটদানে বিরত থাকার হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ, যা ১৯৯৮ সালের পর সাধারণ নির্বাচনে সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় কোন প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি বেশি বেড়েছে, তা চূড়ান্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে লুলা শ্রমজীবী মানুষের সমর্থন বাড়াতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
ব্রাজিলের নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলসোনারো পরিবারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের।
অন্যদিকে, লুলা তাঁর নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও জইর বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যকে তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বিজয়ী হওয়ার পর দেওয়া ভাষণে লুলা বলেন, চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পথে তাঁকে বিদেশ থেকে আসা হস্তক্ষেপের চেষ্টাও মোকাবিলা করতে হয়েছে। তিনি নির্বাচনের ফলকে মিথ্যা তথ্য ও অস্বীকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে বর্ণনা করেন।
সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে লুলা বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষে ব্রাজিলের জনগণের শক্তিই তাঁকে এই বিজয় এনে দিয়েছে।
লুলার এই জয় তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেও নির্বাচন-পরবর্তী আইনি বিরোধ, ভোটগ্রহণ নিয়ে অভিযোগ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ ব্রাজিলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব বিরোধ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা আগামী দিনে দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।