Monday, October 26, 2026

ইসরায়েলের ভোটে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, ঘরে ফেরার স্বপ্ন বাস্তুচ্যুতদের


ছবিঃ গাজায় ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন এমন এক পরিস্থিতিতে, যেখানে অব্যাহত বাস্তুচ্যুতি, বিধিনিষেধ এবং নিজেদের জীবন পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। (সংগৃহীত । আবদেলহাকিম আবু রিয়াস/আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর অবরুদ্ধ জীবনের দীর্ঘ দুর্ভোগের মধ্যে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। দেশটির নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে গাজায় হামলা, অবরোধ ও বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে যেমন আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি সামান্য আশাও দেখা যাচ্ছে।

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য। এর পাশাপাশি অবরোধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলকে নিজেদের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করছেন অনেক ফিলিস্তিনি।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে গাজার কয়েকজন বাস্তুচ্যুত বাসিন্দার অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ইসরায়েলে নতুন সরকার নির্বাচনের ভোট হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে দেশটিতে সমালোচনা রয়েছে। তাঁর সরকারের উগ্র ডানপন্থী কয়েকজন সদস্য গাজা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সেখানকার জনগণকে বিতাড়নের পক্ষেও বক্তব্য দিয়েছেন।

গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এলিয়ান বর্তমানে দেইর আল-বালাহ এলাকায় পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। তাঁর আশা, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমতে পারে।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে পারে, তা বোঝার জন্য তাঁরা ইসরায়েলের নির্বাচন অনুসরণ করছেন। নতুন নেতৃত্ব এলে ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি এবং বারবার বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশা করেন।

এলিয়ানের প্রত্যাশা, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা গাদি আইজেনকট নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন। তবে তিনি মনে করেন, নতুন সরকার এলেও ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তাঁর দাবি, গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, বাস্তুচ্যুতি রোধ, দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সীমান্ত দিয়ে পণ্য প্রবেশের বিধিনিষেধ শিথিল করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৪১ বছর বয়সী ইসলাম সালেমও নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিন মেয়ের এই বাবা মনে করেন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গাজার মানুষের জীবনযাত্রা ও তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। তবে নতুন মুখ সরকারে এলেও গাজা নিয়ে দেশটির সামগ্রিক নীতি বদলাবে এমন প্রত্যাশা তাঁর নেই।

সালেমের মতে, গাজার পুনর্গঠনও সহজ হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে বিস্তীর্ণ এলাকার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত এলাকার বিষয়টিও বাস্তুচ্যুতদের ঘরে ফেরার সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলছে।

যুদ্ধের দীর্ঘ প্রভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবস্থা অনেকের নেই বলেও জানান সালেম। তাঁর ভাষায়, প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাঁদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে। যে পরিস্থিতিগুলো নিয়ে আগে ভয় ছিল, তার অনেক কিছুই ইতিমধ্যে তাঁদের জীবনে ঘটে গেছে।

গাজায় ১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৫৭ বছর বয়সী হানান আবু আল-মাজা। নতুন ইসরায়েলি সরকার আরও কঠোর হলে পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে রাতে ঘুমাতে গেলেও পরদিন কী ঘটবে, তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ কাটে না।

তবে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে নিজের বাড়ি বেইত লাহিয়ায় ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করেন হানান। তাঁর চাওয়া, নতুন নেতৃত্ব যুদ্ধ বন্ধ করে গাজার মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দিক।

উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত ২৩ বছর বয়সী মানার ওওয়াইদাও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে অবরোধ ও হামলার মাত্রা কমতে পারে। একই সঙ্গে ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে থাকা এলাকাগুলো থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরে গেলে গাজায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে তাঁর ভয়, নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় নেতানিয়াহু বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের পথ বেছে নিতে পারেন। তাই নতুন সরকার যেই গঠন করুক, ফিলিস্তিনিদের যেন আর সহিংসতা ও প্রাণহানির আতঙ্কে দিন কাটাতে না হয় সেটিই তাঁর প্রধান প্রত্যাশা।

বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৩ বছর বয়সী মুসা আলী বর্তমানে চার সন্তানকে নিয়ে গাজা সিটিতে বসবাস করছেন। তাঁর কাছে নির্বাচনের ফল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত মানুষ নিজেদের এলাকায় ফিরতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নে। তিনি আশা করেন, ইসরায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বাস্তুচ্যুতদের ফেরার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তুলনামূলক ইতিবাচক ভূমিকা নেবে। আরব দলগুলো ভালো ফল করলে নতুন সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে আলীরও আশঙ্কা, নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেও গাজায় হামলা ও নিয়ন্ত্রণের নীতিতে বড় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তাঁর মতে, প্রতিদিনের প্রাণহানি ও বোমাবর্ষণ বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

গাজার বাসিন্দাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, ইসরায়েলের নির্বাচন তাঁদের কাছে শুধু একটি দেশের সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং নিরাপত্তা, ঘরে ফেরার অধিকার, পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন নিয়ে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জড়িত। তবু দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে তাঁদের প্রত্যাশা নতুন নেতৃত্ব অন্তত সহিংসতা কমিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন