- ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা আলেকসান্ডার ভুসিচের রাজনৈতিক দুর্গে বড় ধস নেমেছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে আগাম সংসদ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী এই নেতা।
২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আগাম সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলের ভিত্তিতে ভুসিচ নিজেই জানিয়েছেন, তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট নির্বাচনে হেরে গেছে। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২৫০ আসনের সংসদে ছাত্রদের সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। আর ভুসিচের রাজনৈতিক শিবির পেতে পারে প্রায় ১০৫টি আসন। তবে ভোটের পূর্ণাঙ্গ সরকারি ফল তখনও প্রকাশ হয়নি।
ভুসিচের এই পরাজয়কে শুধু একটি নির্বাচনের ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে না। সার্বিয়ার রাজনীতিতে এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের বড় ধরনের রায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কারণ ২০১২ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি এবং ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভুসিচই ছিলেন দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
এবার সেই শক্ত অবস্থানকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে কোনো পুরোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন।
সার্বিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্পের শুরু ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর।
দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের প্রবেশপথের ওপরের ছাদ বা ছাউনি হঠাৎ ধসে পড়ে। এতে ১৬ জন নিহত হন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পরই প্রশ্ন ওঠে—রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজে অনিয়ম হয়েছিল কি না, নির্মাণকাজে দুর্নীতি ছিল কি না এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। প্রথম দিকে তাদের দাবি ছিল মূলত নিহতদের জন্য বিচার, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ প্রকাশ এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আন্দোলন আর শুধু একটি রেলস্টেশন দুর্ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুর্নীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবকিছুই আন্দোলনের দাবির অংশ হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন, বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন এবং দেশজুড়ে পদযাত্রা শুরু করেন। বড় শহরের পাশাপাশি তারা ছোট শহর ও গ্রামেও পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এর ফলে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে রাজধানীকেন্দ্রিক বিক্ষোভ থেকে জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।
২০২৫ সালের মার্চে বেলগ্রেডে আন্দোলনের একটি সমাবেশে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন জানিয়েছিল। পরে শিক্ষার্থীরা সরাসরি আগাম নির্বাচনের দাবিও তোলে।
শুরুতে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক দল তৈরি করা নয়। বরং শিক্ষার্থীরা নিজেদের আন্দোলনকে প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখতে চেয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর তারা বুঝতে পারে, শুধু রাস্তায় বিক্ষোভ করে ভুসিচ সরকারের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। সেখান থেকেই তৈরি হয় ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ বা ছাত্রদের নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম।
এই তালিকায় শুধু শিক্ষার্থী ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ক্রীড়াবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে প্রার্থী করা হয়। ২৫০ আসনের সংসদের জন্য ২৫০ জন প্রার্থী বাছাই করা হয়।
তালিকার শীর্ষে ছিলেন নোভি সাদের মেডিকেল অনুষদের অধ্যাপক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানভিচ। তবে তিনি নিজেকে আন্দোলনের একক নেতা হিসেবে তুলে ধরেননি। বরং পুরো উদ্যোগটিকে নেতৃত্বনির্ভর না করে বিকেন্দ্রীভূত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
এটাই ছিল ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত সার্বিয়ান রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এখানে কোনো একক নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর পুরো আন্দোলন দাঁড় করানো হয়নি।
আলেকসান্ডার ভুসিচ সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন কোনো নাম নন। ১৯৯৩ সালে তিনি ভোজিস্লাভ শেশেলির নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান র্যাডিক্যাল পার্টিতে যোগ দেন। তখন তিনি ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক।
পরবর্তীতে তিনি রাজনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনেন। ২০১২ সালে তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে। দুর্নীতি ও সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি জনপ্রিয়তা পায়।
২০১৪ সালে ভুসিচ প্রধানমন্ত্রী হন। ২০১৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ সময়ের মধ্যে সার্বিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে।
তার সমর্থকেরা মনে করেন, ভুসিচের সময়ে সার্বিয়ার অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বেকারত্ব কমেছে, বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে এবং বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। মহাসড়ক ও দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণও তার সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ ছিল ভিন্ন। তাদের দাবি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে। ভুসিচ সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা, বিরোধীদের ওপর চাপ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
নোভি সাদের রেলস্টেশন দুর্ঘটনাই শেষ পর্যন্ত ভুসিচবিরোধী অসন্তোষকে বিস্ফোরিত করে। দুর্ঘটনার পর আন্দোলনকারীরা প্রশ্ন তোলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে কীভাবে এমন বিপর্যয় ঘটল। তাদের অভিযোগ ছিল, সংস্কারকাজে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা থাকলে তার দায় শুধু প্রকৌশলী বা ঠিকাদারের নয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থারও।
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের অন্যতম অভিযোগ ছিল—ঘটনার প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশে যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখানো হয়নি। সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমে ‘দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন’-এ পরিণত হয়।
আন্দোলন যত বড় হয়েছে, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘাতও তত বেড়েছে। ভুসিচ আন্দোলনকারীদের ‘ব্লকার’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তোলেন। ক্ষমতাসীন শিবিরের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করার অভিযোগও করা হয়েছিল।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, তাদের ওপর নজরদারি, ভয় দেখানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিবেদনে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ এবং আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের কথাও উঠে এসেছে। তারপরও আন্দোলন থামেনি। বরং শিক্ষার্থীদের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়তে থাকে।
২৫ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ২২ অক্টোবর বেলগ্রেডে ছাত্র আন্দোলনের শেষ বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে স্বাধীন জনসমাবেশ পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই সমাবেশে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর ২৫০ প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তাদের প্রচারের মূল বার্তা ছিল—সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনতে হবে।
রোববারের নির্বাচনেও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোট পড়েছিল প্রায় ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর থেকে এটি ছিল সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির অন্যতম উদাহরণ। মোট ভোটার ছিল প্রায় ৬৫ লাখ এবং সংসদে আসন ছিল ২৫০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১২৬টি আসন।
উচ্চ ভোটার উপস্থিতিকে ছাত্র আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ আন্দোলনকারীদের বড় লক্ষ্য ছিল এমন মানুষদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা, যারা সাধারণত নির্বাচনে সক্রিয় থাকেন না।
তবে ভোটের দিনও বিতর্ক ছিল। স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংগঠন সিআরটিএ জানিয়েছে, তারা যে ৫০০টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভোটার বা নির্বাচনকর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ পেয়েছে। ব্যালটের গোপনীয়তা রক্ষা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আরেকটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংগঠন সিইএসআইডি প্রায় ২৬০টি সম্ভাব্য অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে ব্যালটের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়া এবং ভোটার শনাক্তকরণে সমস্যার কথাও ছিল।
ভুসিচের জন্য এই নির্বাচন ছিল রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের চাপের মধ্যে তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর তার দল তাকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সামনে আনে।
অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ভবন ছাড়লেও তিনি কার্যত দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চেয়েছিলেন। আগাম নির্বাচন ডাকার মাধ্যমে তিনি চেষ্টা করেছিলেন সংসদে আবারও নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু নির্বাচনের ফল সেই পরিকল্পনাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ভুসিচ নিজেই এখন পরাজয় মেনে নিয়েছেন। তার এই স্বীকারোক্তি সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১২ সালের পর থেকে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে তার রাজনৈতিক শিবিরকে এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি।
প্রাথমিক হিসাবে ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেলে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ এককভাবেই সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় ১২৬ আসনের সীমা পার করতে পারবে। তবে সামনে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়।
রাজনীতিতে তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত। আন্দোলনের সময় তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ছিল, সরকার পরিচালনার সময় সেসবের বাস্তব সমাধান করা অনেক কঠিন হবে।
দুর্নীতি বন্ধ করা, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তাদের আমলাতন্ত্র, প্রশাসন ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া অর্থনীতি সামলানোও বড় পরীক্ষা হবে।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হতে পারে পররাষ্ট্রনীতি। ভুসিচের সময়ে সার্বিয়া একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
ছাত্র আন্দোলনও এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। এর অন্যতম কারণ ছিল—পররাষ্ট্রনীতির বিতর্কে বিভক্ত না হয়ে তারা প্রথমে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছে। ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে।
কসোভো ইস্যুও তাদের জন্য স্পর্শকাতর। সার্বিয়ার সংবিধান কসোভোকে দেশের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ছাত্র আন্দোলনও এ বিষয়ে সংবিধানভিত্তিক অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ ভুসিচের পর নতুন সরকার এলেই সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে রাতারাতি বড় পরিবর্তন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচনে পরাজয় ভুসিচের রাজনৈতিক প্রভাবকে বড় ধাক্কা দিলেও তাকে সার্বিয়ার রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিদায় নেওয়া ব্যক্তি হিসেবে এখনই দেখা কঠিন।
তার দল এখনো সংসদে বড়সংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে তিনি যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছেন, তার অনেক অংশই এখনো সক্রিয়। তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি—‘ভুসিচ ছাড়া সার্বিয়ার স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়’—এই রাজনৈতিক ধারণাটিই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
প্রায় দুই বছর আগে একটি রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ মানুষের মৃত্যুর পর যে আন্দোলনের শুরু, সেটিই শেষ পর্যন্ত দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার জায়গায় শিক্ষার্থীরা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে সংগঠিত করেছে। তারা শুধু সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়নি; শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরি করেছে। এই কারণে সার্বিয়ার এবারের নির্বাচনকে শুধু ভুসিচের পরাজয় হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটির গুরুত্ব বোঝা যাবে না।
এটি একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থান, দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমতের পরিবর্তন এবং একটি আন্দোলনের রাজপথ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার দিকে যাত্রার গল্প।
বেলগ্রেডের রাস্তায় নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের উল্লাস তাই শুধু একটি নির্বাচনী বিজয়ের উদযাপন ছিল না। তাদের কাছে এটি ছিল প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনের পর পাওয়া একটি রাজনৈতিক স্বীকৃতি।
আর সার্বিয়ার জন্য—এটি সম্ভবত এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি এবং নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের শুরু।