- ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাইজে হুতিদের নতুন করে অবরোধের কারণে ভয়াবহ সংকটে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। জ্বালানি, ওষুধ ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা উপকরণের সংকটে একের পর এক হাসপাতালের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস চিকিৎসা নিয়ে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ডিজেলের মজুত ফুরিয়ে আসায় যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসাসেবা।
তাইজ শহরের সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অবস্থিত রিপাবলিকান হাসপাতালের ডায়ালাইসিস কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসা নেন ১৬ বছর বয়সী ওমর মুখতার হামুদ। কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ায় তাঁর বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন। কিন্তু জ্বালানি ও বিশেষায়িত চিকিৎসা তরলের সংকটে কেন্দ্রটিতে চিকিৎসার সময় কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকেরা।
কেন্দ্রটির পরিচালক চিকিৎসক এসাম মাহিউব দাহান জানান, অবরোধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের ঘাটতির কারণে রোগীদের ডায়ালাইসিসের সময় চার ঘণ্টা থেকে কমিয়ে আড়াই ঘণ্টা করা হয়েছে। এতে রোগীদের শরীর থেকে পর্যাপ্ত তরল ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও কেন্দ্রটি যত দিন সম্ভব চালু রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
দাহান সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই ডায়ালাইসিস কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিশেষায়িত ডায়ালাইসিস তরলের মজুতও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সাধারণত প্রতি তিন মাসে এসব উপকরণ সরবরাহ করে। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে যে চালান পৌঁছানোর কথা ছিল, হুতিদের অবরোধের কারণে তা আসেনি।
চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে তাইজের গ্রামীণ এলাকায় হুতিদের অগ্রযাত্রার পর শহরটিতে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়। এর আগে ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধের শুরুর দিকে ২০১৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শহরটি হুতিদের পূর্ণ অবরোধের মুখে ছিল।
তাইজ শহরের সংকট পুরো প্রদেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। প্রাদেশিক স্বাস্থ্য দপ্তরের ১২ অক্টোবরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, অবরোধ অব্যাহত থাকা এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে বাধার কারণে প্রদেশটির ১ হাজার ১১০ জন কিডনি রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এসব রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন সম্মিলিতভাবে প্রায় ২১০টি ডায়ালাইসিস সেশন পরিচালিত হয়।
আন্তর্জাতিক মানবিক ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হুতিদের তাইজ শহর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অবিলম্বে খুলে দেওয়ার আহ্বান জানায়। সংস্থাটির সতর্কতা, তাইজ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে যাতায়াতের প্রধান সড়ক বন্ধ থাকায় কয়েক লাখ বেসামরিক মানুষের খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ হুমকির মুখে পড়েছে।
যুদ্ধের কারণে তাইজের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরটির হাসপাতালগুলোকে বিদ্যুতের জন্য ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু অবরোধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে হাসপাতালের জরুরি যন্ত্রপাতি চালু রাখা থেকে শুরু করে রোগীদের চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই সংকট দেখা দিয়েছে।
রিপাবলিকান হাসপাতালের উপমহাপরিচালক (কারিগরি বিষয়) চিকিৎসক শহীদ আল-আমেরি বলেন, ডিজেলের ঘাটতি চিকিৎসাসেবায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। অবরোধের শুরুতেই হাসপাতালের সংরক্ষিত জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এখন কালোবাজার থেকে প্রায় প্রতিদিন ডিজেল কিনতে হচ্ছে, যার দাম অবরোধের আগের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালের কয়েকটি বিভাগে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২২ অক্টোবর সতর্ক করে জানায়, তাইজ প্রদেশজুড়ে জ্বালানি, অক্সিজেন, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট জীবনরক্ষাকারী সেবাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, তাইজ শহরের ৪২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান জরুরি উপকরণের গুরুতর ঘাটতির কথা জানিয়েছে। হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের কার্যক্রম সচল রাখতে প্রতি মাসে অন্তত ১ লাখ ৫৬ হাজার লিটার জ্বালানি প্রয়োজন।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, ডিজেলের অভাবে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন উৎপাদন, পানি সরবরাহ, টিকা সংরক্ষণ এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারে। এতে বাস্তুচ্যুত পরিবার ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা বাড়বে। জাতিসংঘও তাইজের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধসের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে সতর্ক করে মানবিক সহায়তা ও জরুরি পণ্য প্রবেশে বাধা দূর করার আহ্বান জানিয়েছে।
তাইজের স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন উৎপাদনকেন্দ্রগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে অস্ত্রোপচারকক্ষ, সাধারণ ওয়ার্ড, নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র এবং অপরিণত নবজাতকের ইনকিউবেটর পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্বাস্থ্য দপ্তরের গণমাধ্যম কর্মকর্তা তায়সির আল-সামেই বলেন, ডিজেল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তরলের অভাবে অনেক হাসপাতালের কয়েকটি বিভাগে ইতিমধ্যে সেবা বন্ধ রয়েছে। পরিবহন সংকটে চিকিৎসাকর্মীদের কর্মস্থলে পৌঁছাতেও সমস্যা হচ্ছে। এভাবে পরিস্থিতির অবনতি চলতে থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কিছু হাসপাতাল সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
রিপাবলিকান হাসপাতালেও রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কার্যক্রমে সংকট দেখা দিয়েছে। আল-আমেরির ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপকরণের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। নিয়মিত মজুত থাকা ওষুধের প্রায় অর্ধেকই এখন পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব ওষুধ অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর দামও দ্বিগুণ হয়েছে। ইয়েমেনের চলমান অর্থনৈতিক সংকটে এমনিতেই বিপর্যস্ত রোগীদের জন্য এসব ওষুধ কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে তাইজের আশপাশে নতুন করে লড়াই ও গোলাবর্ষণের কারণে আহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এতে জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, অবেদন এবং শিরায় তরল দেওয়ার উপকরণের চাহিদা বেড়েছে। অথচ এসব সরঞ্জামের সরবরাহও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
রিপাবলিকান হাসপাতালের আরেক ডায়ালাইসিস রোগী ৫৩ বছর বয়সী আবদুল বদি আবদুলওয়াহাব। চিকিৎসার সময় কমিয়ে দেওয়ায় তাঁর শারীরিক দুর্বলতা ও যন্ত্রণা বেড়েছে। তিনি জানান, আড়াই ঘণ্টার ডায়ালাইসিসে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তরল ও বিষাক্ত পদার্থ বের করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আগের মতো স্বস্তি পাচ্ছেন না তিনি।
চিকিৎসক দাহানও স্বীকার করেছেন, সংক্ষিপ্ত সময়ের ডায়ালাইসিস অনেক রোগীর জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না এবং কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। তাঁর মতে, রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে অবরোধের অবসান ঘটিয়ে জ্বালানি ও চিকিৎসা উপকরণের স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।
তাইজের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু হাসপাতালগুলোর সংকট নয়; এটি হাজারো রোগীর জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কিডনি রোগীদের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা, অক্সিজেন ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী সেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।