- ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন ঘিরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও লেবাননের মানুষের মধ্যে আশাবাদ খুব একটা নেই। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, দখলদারত্ব ও অবকাঠামো ধ্বংসের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হলেও তার অবসান হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে দেশটির নাগরিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বাসিন্দা ফুয়াদ দেবসের মতে, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও লেবাননের পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি ভালো দেখাতে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামান্য কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশের প্রতি নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন নাও ঘটতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ও বৈরুতভিত্তিক তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির অনাবাসিক ফেলো করিম সাফিয়েদ্দিনও মনে করেন, ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচারে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতিকে সংকট বা ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার প্রবণতাও ইসরায়েলি রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় সংঘাত চলছে। ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে সংঘাতের বিস্তার ঘটে লেবাননেও। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। মার্চের উত্তেজনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর নতুন মাত্রা পায়।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবানন সরকার একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছায়। এতে ধাপে ধাপে লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সমঝোতার পরও দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামে বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংঘাতের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে লেবাননের মানুষের মধ্যেও কৌশলগত মতপার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জাদ মেলকি ও তাঁর দলের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫৪ শতাংশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগের পক্ষে এবং ৩৫ শতাংশ সশস্ত্র প্রতিরোধকে সমর্থন করেন। তবে পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ থাকলেও জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট। সাবেক এই সেনাপ্রধানকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে লেবাননের বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও দক্ষিণ লেবানন নিয়ে ইসরায়েলের সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
আইজেনকোটের সঙ্গে লেবাননের সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধে তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় ফ্রন্টের কমান্ডার ছিলেন। সামরিক কৌশল হিসেবে পরিচিত ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’-এর সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িত। এই কৌশলে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়টি গুরুত্ব পায় বলে সমালোচকেরা মনে করেন। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ধরন নিয়েও এ কৌশল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার, ২০২৩ সালের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির চেয়ে সামরিক অভিযানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সমালোচনা রয়েছে। তবে আইজেনকোটসহ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বক্তব্যে নেতানিয়াহুর নিরাপত্তানীতি যথেষ্ট কঠোর নয় এমন অভিযোগই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে লেবাননের বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ।
আইজেনকোট এর আগে অভিযোগ করেছেন, বৈরুতে হামলা বন্ধের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, লেবাননের যেকোনো স্থানে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সুযোগ থাকা উচিত। এ ধরনের অবস্থান লেবাননের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
লেবাননের গবেষক ও পডকাস্টার এলিয়া আয়ুবের মতে, ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা মূলত যুদ্ধ পরিচালনা ও নিরাপত্তা প্রশ্নে তাঁকে আক্রমণ করছেন। মানবিক সংকট বা মানবাধিকারের বিষয়গুলো তাঁদের বক্তব্যে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আয়ুবের পর্যবেক্ষণ, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ও জনগণের প্রতি ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বর্তমান সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলি সমাজের একটি অংশে অন্য জনগোষ্ঠীকে অমানবিকভাবে দেখার প্রবণতা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকলে শুধু সরকার বদলের মাধ্যমে লেবানন নিয়ে ইসরায়েলের নীতি পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
লেবাননে চলমান পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বড় ধরনের সংঘর্ষ আপাতত কমে এলেও ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। দখলদারত্ব দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কাও বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
সাফিয়েদ্দিনের ভাষায়, লেবানন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে পুরোপুরি যুদ্ধও নেই, আবার শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁর আশঙ্কা, এই অনিশ্চিত অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেরও বড় প্রভাব রয়েছে। এ কারণে আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আয়ুবের মতে, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েল কতটা স্বাধীনভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ পাবে, তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফিলিস্তিনের পাশাপাশি লেবানন ও সিরিয়ার পরিস্থিতিতেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতৃত্ব বদলের সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষিণ লেবাননে দখলদারত্বের অবসান, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো আশার আলো দেখছেন না লেবাননের অনেক মানুষ।