Monday, October 26, 2026

প্রেমের ফাঁদে তরুণী, আড়ালে ভয়ংকর পরিকল্পনা: সিডনি হত্যার পূর্ণ কাহিনি


ছবিঃ ‘সোয়াইপ রাইট অন দ্য ডেভিল’–এর বিভিন্ন দৃশ্য (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN

অনলাইন ডেটিং অ্যাপ টিন্ডারে পরিচয়, এরপর একসঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু দ্বিতীয় ডেটে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের ২৪ বছর বয়সী তরুণী সিডনি লুফের। ২০১৭ সালের নভেম্বরে নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর খণ্ডিত দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে সামনে আসে প্রতারণা, যৌন নির্যাতন, কথিত জাদুবিদ্যা এবং পরিকল্পিত হত্যার এক ভয়াবহ ঘটনা।

বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র সিরিজ ‘সোয়াইপ রাইট অন দ্য ডেভিল’। মার্কিন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলুর এই ট্রু ক্রাইম সিরিজে সিডনি হত্যার পাশাপাশি উঠে এসেছে একটি কথিত গোপন গোষ্ঠীর কার্যক্রম, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রতারণার কৌশল এবং সেখান থেকে পালিয়ে আসা নারীদের অভিজ্ঞতা।

তথ্যচিত্রটিতে কথা বলেছেন ওই গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে আসা তিন নারী, তদন্তের সঙ্গে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সিডনির পরিবারের লোকজন। তাঁদের বক্তব্য ও তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে কীভাবে একজন তরুণীকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা সিডনি লুফে লিংকনের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে কাজ করতেন। ২০১৭ সালে টিন্ডারে ‘অড্রে’ নাম ব্যবহার করা এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে দুবার তাঁদের দেখা হয়।

১৫ নভেম্বর দ্বিতীয়বার ডেটে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন সিডনি। পরদিন কর্মস্থলে না যাওয়ায় তাঁর সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। তাঁরা পুলিশকে খবর দেন। সিডনির বাড়িতে গিয়ে তাঁর গাড়ি ও পার্স পাওয়া গেলেও তাঁকে খুঁজে পায়নি পুলিশ।

এদিকে সিডনির এক বন্ধু নিজেই টিন্ডারে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অড্রেকে খুঁজতে শুরু করেন। সেই সূত্র ধরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, অড্রে আসলে বেইলি বসওয়েল নামের ২৩ বছর বয়সী এক নারী।

সিডনির খোঁজ চলতে থাকে। অবশেষে ৪ ডিসেম্বর ক্লে কাউন্টির একটি মহাসড়কের পাশ থেকে ময়লার ব্যাগে তাঁর দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। তাঁর দেহ ১৪ টুকরা করা হয়েছিল। দেহের কিছু অংশ ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গও পাওয়া যায়নি।

দেহাবশেষ উদ্ধারের পর তদন্ত নতুন দিকে মোড় নেয়। সামনে আসে বেইলি বসওয়েল ও তাঁর সঙ্গী অউব্রে ট্রেইলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক নারীর অভিজ্ঞতা।

তদন্তে অউব্রে ট্রেইলের নাম উঠে আসে। ৫১ বছর বয়সী ট্রেইল নিজেকে ভ্যাম্পায়ার বলে পরিচয় দিতেন। বেইলি বসওয়েলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চুরি ও আর্থিক প্রতারণার ইতিহাসও সামনে আসে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা অনলাইনে পরিচিত হওয়া নারীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতেন। কথিত এই গোষ্ঠীকে তাঁরা ‘কোভেন’ বলে উল্লেখ করতেন—যে শব্দটি সাধারণত জাদুবিদ্যার চর্চাকারীদের গোষ্ঠী বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

পরে বিশের কোঠায় থাকা তিন নারী আদালতে সাক্ষ্য দেন। তথ্যচিত্রেও তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসওয়েলের সঙ্গে পরিচয়ের পর ট্রেইলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ হয়। দামি পোশাক, স্পা-সেবা, মাদক এবং প্রতি সপ্তাহে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার দেওয়ার মতো প্রলোভন দেখানো হতো। বিনিময়ে তাঁদের যৌন সম্পর্কে অংশ নেওয়া এবং চুরি করা জিনিস বিক্রিতে সহায়তা করার চাপ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

ট্রেইল অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী বলেও দাবি করতেন। তিনি উড়তে পারেন কিংবা অন্যের মনের কথা বুঝতে পারেন এমন কথাও বলতেন বলে নারীরা জানান। তাঁদের ‘ডাইনি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে গোষ্ঠীর নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করা হতো।

তথ্যচিত্রে উঠে আসা নারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রেইল নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর নামে কাউকে নির্যাতন করে হত্যার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। হত্যার দৃশ্য ধারণ করে তা থেকে অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে।

গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে আসা নারীদের একজন জানান, ট্রেইল তাঁদের বলেছিলেন, গোষ্ঠীতে ১২ জন নারী রয়েছেন এবং কথিত একটি আচার সম্পন্ন করতে ত্রয়োদশ একজনকে প্রয়োজন। অন্য এক নারী অভিযোগ করেন, গোষ্ঠীতে থাকতে হলে ট্রেইলের সামনে নগ্ন হতে হতো এবং অন্যদের যৌন সম্পর্কও দেখতে বাধ্য করা হতো।

তবে সিডনির হত্যাকাণ্ডের আগেই ওই তিন নারী গোষ্ঠীটি ছেড়ে চলে যান।

তদন্তের অংশ হিসেবে ট্রেইল ও বসওয়েলের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে ডাক্ট টেপ, জিপ টাই, কুঠার, রক্তমাখা প্লাস্টিকের চাদর, বিশেষ পোশাক এবং একটি বইসহ বিভিন্ন বস্তু পাওয়া যায় বলে তথ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিডনি হত্যার ঘটনায় ট্রেইল একপর্যায়ে দায় স্বীকার করলেও ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেননি। তাঁর দাবি ছিল, সম্মতিতে চলা একটি যৌন আচারের সময় এক্সটেনশন কর্ড দিয়ে সিডনির গলায় চাপ পড়ে। পরে ধরা পড়ার ভয়ে তিনি দেহ টুকরা করেন। একই সঙ্গে বসওয়েল হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে তদন্তে পাওয়া বার্তাগুলোতে বসওয়েলকে নিজের ওপর দায় চাপাতে এবং নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে বলার অভিযোগ সামনে আসে।

বিচার চলাকালে আদালতে বসওয়েলকে নির্দোষ ঘোষণা করে চিৎকার করার পর ট্রেইল ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের গলা কাটার চেষ্টা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তিনি হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের মতো শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন।

পরবর্তী সময়ে নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করে ট্রেইল বলেন, তাঁর জীবনযাপন প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি সিডনিকে হত্যা করেছিলেন।

সিডনি লুফেকে হত্যা, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং মানবদেহের অবশিষ্টাংশ বেআইনিভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগে ট্রেইল দোষী সাব্যস্ত হন। ২০২১ সালের ৯ জুন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে তাঁর আপিল খারিজ হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বসওয়েলের বিচার শুরু হয়। সিডনির দেহাবশেষ রাখা ব্যাগে পাওয়া একটি ল্যাটেক্স গ্লাভসে বসওয়েলের ডিএনএ শনাক্ত হওয়ার তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ওই বছরের অক্টোবরে তিনি সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০২১ সালের নভেম্বরে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তথ্যচিত্রটির পরিচালক ও নির্বাহী প্রযোজক ব্রায়ান বিগেল প্রায় তিন বছর ধরে সিডনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করেন। এ সময় তিনি ট্রেইলের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রেখে তাঁর আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন। পাশাপাশি কথা বলেন গোষ্ঠী থেকে পালিয়ে আসা নারীদের সঙ্গে।

বিগেলের মতে, এটি শুধু একজন তরুণীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্পর্কের খোঁজে থাকা নারীদের প্রতারণার ফাঁদে পড়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিজ্ঞতা।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে সমকামী সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক বাধা ও একাকিত্বের মুখোমুখি হওয়া নারীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিলেন বসওয়েল ও ট্রেইল। টিন্ডারের মাধ্যমে পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে তাঁদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যচিত্রটির আরেক নির্বাহী প্রযোজক ক্রিস্টোফার সেন্ট জন জানান, ঘটনার সঙ্গে এত বেশি তথ্য ও অভিজ্ঞতা জড়িত ছিল যে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে সবকিছু তুলে ধরা কঠিন হতো। এ কারণেই তিন পর্বে গল্পটি সাজানো হয়।

সিডনির মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে তাঁর পরিবার ‘সিডনি লুফে ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করে। সংস্থাটি বৃত্তির জন্য ৩০ হাজার ডলারের বেশি এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে সহায়তার জন্য আরও ২৬ হাজার ডলার সংগ্রহ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের জীবনে নানা শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক সমস্যার মধ্যেও সিডনি অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। পরিবার, পোষা বিড়াল, মাছ ধরা এবং সুন্দর ক্রিস্টালের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাঁর হাতে উল্কি করে লেখা ছিল, ‘একদিন সবকিছু সুন্দর হবে।’

সিডনি লুফের হত্যাকাণ্ডের এই বিবরণ অনলাইন ডেটিংয়ের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে প্রতারণা এবং অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার দাবি ব্যবহার করে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার ভয়াবহ দিক সামনে এনেছে। ‘সোয়াইপ রাইট অন দ্য ডেভিল’ শুধু একটি হত্যার তদন্ত নয়; বরং বিশ্বাস, একাকিত্ব ও প্রতারণার সুযোগ নিয়ে কীভাবে মানুষকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলা যায়, সেই প্রশ্নও তুলে ধরে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন