Thursday, October 22, 2026

বিয়ের দুই মাস পর স্বামীর গুলিবিদ্ধ মরদেহ, হলিউড তারকা জিন হার্লোকে ঘিরে রহস্য আজও


ছবিঃ জিন হার্লো ও চলচ্চিত্র প্রযোজক পল বার্ন (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

রুপালি আভামাখা স্বর্ণালি চুল, পর্দায় আকর্ষণীয় উপস্থিতি আর সহজাত কৌতুকাভিনয়—এসব বৈশিষ্ট্যেই হলিউডের সোনালি যুগে আলাদা পরিচিতি পেয়েছিলেন জিন হার্লো। ‘প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রী অল্প বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন চলচ্চিত্রজগতের আলোচিত তারকা। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া একটি মৃত্যু আজও ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত রহস্য হয়ে আছে।

১৯৩২ সালে বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় হার্লোর স্বামী, চলচ্চিত্র প্রযোজক পল বার্নের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয় তাঁদের বাড়ি থেকে। ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় একটি রহস্যময় চিঠি। প্রাথমিক তদন্তে বার্নের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হলেও পরবর্তী সময়ে হত্যাকাণ্ডের তত্ত্ব সামনে আসে। তবে নানা জল্পনা ও পুনঃতদন্তের পরও তাঁর মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

জিন হার্লোর প্রকৃত নাম ছিল হারলিন কারপেন্টার। ১৯১১ সালের ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের কানসাস সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করার পর মায়ের বিয়ের আগের নাম গ্রহণ করে পরিচিত হন জিন হার্লো হিসেবে।

১৯৩০ সালে হাওয়ার্ড হিউজের হেলস অ্যাঞ্জেলস ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের নজরে আসেন তিনি। পরে প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড ও রেড-হেডেড ওম্যান ছবিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা আরও বাড়ান। সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাঁর অভিনয়ের সাবলীলতা ও কৌতুকবোধ তাঁকে সমসাময়িক অভিনেত্রীদের মধ্যে স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।

পল বার্ন ছিলেন মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের (এমজিএম) একজন প্রভাবশালী প্রযোজক। স্টুডিওর প্রযোজনা বিভাগের প্রধান আরভিং থালবার্গের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে পরিচিত বার্ন হার্লোর অভিনয়জীবন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, এরপর বিয়ে। ১৯৩২ সালের ২ জুলাই তাঁদের বিয়ে হয়। তখন হার্লোর বয়স ২১ বছর, আর বার্নের ৪২। বয়সের বড় ব্যবধান সত্ত্বেও এই বিয়ে হলিউডে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

কিন্তু সুখের সংসার শুরুর পরপরই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।

১৯৩২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বেভারলি হিলসের বাড়িতে পল বার্নের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে একটি চিঠিও উদ্ধার করা হয়, যেটিকে তদন্তকারীরা তাঁর আত্মহত্যার চিরকুট হিসেবে বিবেচনা করেন।

১৯৩২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে চিঠিটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করা হয়। চিঠিতে বার্ন নিজের কোনো গুরুতর অন্যায় এবং গভীর অপমানবোধের কথা উল্লেখ করেছিলেন। শেষাংশে আগের রাতকে ‘কমেডি’ বলে বর্ণনা করা হলেও ঠিক কোন পরিস্থিতির কথা তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা পরিষ্কার হয়নি।

চিঠির এই অস্পষ্ট বক্তব্য এবং মৃত্যুর পরিস্থিতি ঘটনাটিকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি করে। অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় হার্লোকেও কিছু সময়ের জন্য সন্দেহের মুখে পড়তে হয়। তবে তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বার্নের মৃত্যুর তদন্তে উঠে আসে ডরোথি মিলেট নামের এক নারীর প্রসঙ্গ। বার্নের সঙ্গে অতীতে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। একই সময়ে মিলেটের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে চলচ্চিত্র গবেষক ড্যানিয়েল ইগানের রেড ডাস্ট–বিষয়ক নিবন্ধে বলা হয়েছে, একটি স্টিমার থেকে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর মিলেটের মৃত্যু হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।

বার্ন ও মিলেটের মৃত্যুর সময়কাল এবং তাঁদের অতীত সম্পর্ক নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও এসব ঘটনা বার্নকে হত্যা করা হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করেনি।

বছরের পর বছর ধরে লেখক, সাংবাদিক ও জীবনীকারেরা পল বার্নের মৃত্যুর বিকল্প ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। চিত্রনাট্যকার বেন হেক্টও হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছিলেন।

১৯৬০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দপ্তর ঘটনাটির তদন্ত নতুন করে শুরু করে। এ সময় হার্লোর বাড়িতে কর্মরত ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু নতুন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ায় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে বার্নের সহকর্মী স্যামুয়েল মার্ক্স দাবি করেন, বার্নকে হত্যা করেছিলেন ডরোথি মিলেট এবং কেলেঙ্কারি এড়াতে এমজিএম কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি আড়াল করেছিল। তবে মার্ক্সের এই বক্তব্যও প্রমাণিত হয়নি। তদন্তের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তেও কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ফলে হত্যাকাণ্ডের তত্ত্বটি আলোচনায় থাকলেও সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

স্বামীর মৃত্যুর সময় রেড ডাস্ট ছবিতে অভিনয় করছিলেন হার্লো। ব্যক্তিগত শোক এবং সংবাদমাধ্যমের তীব্র আগ্রহের মধ্যেও তিনি আবার কাজে ফেরেন। পরবর্তী সময়ে ডিনার অ্যাট এইট ও বম্বশেল–এর মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজের তারকাখ্যাতি আরও দৃঢ় করেন।

১৯৩৩ সালে চিত্রগ্রাহক হ্যারল্ড রসনকে বিয়ে করেন হার্লো। তবে সেই সংসারও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; পরের বছরই তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে।

হার্লোর জীবনও দীর্ঘ হয়নি। ১৯৩৭ সালের ৭ জুন কিডনি বিকল হয়ে মাত্র ২৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি। অল্প সময়ের অভিনয়জীবনেই হলিউডে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন এই অভিনেত্রী।

পল বার্নের মৃত্যুর প্রায় এক শতাব্দী পরও রহস্যটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমেনি। তাঁর রেখে যাওয়া চিঠির অস্পষ্ট ভাষা, অতীতের সম্পর্ক এবং পরবর্তী সময়ে উঠে আসা নানা দাবি ঘটনাটিকে বারবার আলোচনায় এনেছে। তবে সব জল্পনার পরও সরকারি নথিতে বার্নের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবেই রয়ে গেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন