Thursday, October 22, 2026

নেতানিয়াহুর সরকার ঠেকাতে ভোটের প্রস্তুতি ফিলিস্তিনিদের, দ্বিধায় ভোটাররা


ছবিঃ ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি ভোট কীভাবে ইসরায়েলের নির্বাচনকে নতুন রূপ দিতে পারে (সংগৃহীত । আল জাজিরা )

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক হতাশা সত্ত্বেও উগ্র ডানপন্থী সরকারের পুনরায় ক্ষমতায় আসার আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁদের অনেকে। তাঁদের প্রত্যাশা, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভোট বাড়লে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটকে ক্ষমতায় থাকা থেকে ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে ইসরায়েলকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ধারণাকে শক্তিশালী করা। আবার অন্যদের মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের নীতি পরিবর্তনের চাপ তৈরি করা সম্ভব।

পূর্ব জেরুজালেমের বেইত হানিনা এলাকার ১৯ বছর বয়সী লাইলা আতামনেহ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে তিনি শুধু নিজের নাগরিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখছেন না; বরং অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান জানানোর মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করছেন।

লাইলা বলেন, পশ্চিম তীর ও গাজার লাখো ফিলিস্তিনির ইসরায়েলের সরকার নির্বাচনে সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই, অথচ দখলদারত্ব ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব তাঁদের ওপরই পড়ে। তাঁদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে নির্বাচনী প্রচারণা অনুসরণ করতে গিয়ে ভাষাগত বাধার মুখেও পড়ছেন তিনি। আরবি ভাষাভাষী লাইলা বলেন, হিব্রু ভাষায় প্রচারিত নির্বাচনী খবর বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয়। তাঁর মতে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ফিলিস্তিনি তরুণদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোট নিয়ে দ্বিধার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পশ্চিম তীর ও গাজায় চলমান সহিংসতা এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনিদের অধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ। হাইফা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আসাদ ঘানেমের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের আশঙ্কা এবং ইসরায়েলের কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতির প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

গ্যালিলি অঞ্চলের একটি দ্রুজ গ্রামে বসবাসকারী ৩৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান নারী হানানও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত মাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা গ্যালিলির ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত মাজদ আল-ক্রুম এলাকার কাছে নতুন একটি অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা করেন। এ ছাড়া ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি নির্বাচনী ভিডিও নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হানানের আশঙ্কা, এ ধরনের ঘটনা ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও নিরাপত্তার ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে। সে কারণেই তিনি নিজে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও ভোট দিতে উৎসাহিত করছেন।

নির্বাচনের আগে আরব নেতৃত্বাধীন রা'আম ও জয়েন্ট লিস্ট দলকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি দল দুটিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। তবে জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে যুক্ত বালাদ দলের নেতা সামি আবু শাহাদেহ আদালতে তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়ার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

এ ঘটনাকে অনেক ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থানের অনিশ্চয়তার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। আরব-ইহুদি সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ থাবেত আবু রাসের মতে, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে নিজেদের অধিকার আক্রান্ত হওয়ার অনুভূতি ভোটদানে অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে।

গত পাঁচটি নির্বাচনে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটদানের হার প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০২২ সালের নির্বাচনে এ হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। এবারের নির্বাচনের আগে একটি ফিলিস্তিনি প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি জানিয়েছেন, বিভিন্ন জরিপে প্রায় ৬২ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকের ভোট দেওয়ার আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাঁদের লক্ষ্য ভোটার উপস্থিতি ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা।

তাঁদের আশা, বেশি ভোট পড়লে ছোট কয়েকটি ডানপন্থী দল নির্বাচনী ন্যূনতম ভোটের সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হতে পারে। এতে সরকার গঠনের সামগ্রিক হিসাব বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট এবং তাঁর বিরোধী জোট কোনোটিই এককভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টের মতো আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিরোধী শিবিরের নেতাদের বক্তব্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে অনীহা দেখা গেছে। বিরোধী নেতা নাফতালি বেনেট বলেছেন, আরব দলগুলো জায়নবাদী নয়, তাই তাঁদের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করা হবে না। সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী রাজনীতির সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী গাদি আইজেনকটও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি ভোটারদের সামনে কৌশলগত ভোট ও রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লাইলা আতামনেহ প্রথমে এমন দলকে ভোট দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, যারা নেতানিয়াহুবিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত জয়েন্ট লিস্টকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনি পরিচয় ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্নে আপস করা তাঁর পক্ষে কঠিন।

অন্যদিকে, ২০২১ সালে রা'আম প্রথম আরব দল হিসেবে ইসরায়েলের একটি সরকারে যোগ দিয়েছিল। দলটির যুক্তি, সরকারে অংশ নিলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য বাজেট, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা আদায়ের সুযোগ বাড়ে। বিশেষ করে বেদুইন জনগোষ্ঠীর অনেক ভোটার দলটির প্রতি সমর্থন দেখাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বীকৃতিহীন গ্রামগুলোর স্বীকৃতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট ক্ষমতায় এলেও ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের সংকটের দ্রুত সমাধান হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে বর্তমান সরকারের নীতির কারণে পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটছে, তা কিছুটা থামানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

থাবেত আবু রাস বলেন, আরব দলগুলো যদি পার্লামেন্টে ১৫ থেকে ১৭টি আসন পায়, তাহলে নির্বাচনের পর তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ। নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে অনীহা দেখালেও সরকার গঠনের আলোচনায় অবস্থান বদলাতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনও নির্দিষ্ট শর্তে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটকে সমর্থনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকায় সংগঠিত অপরাধ ও সহিংসতা মোকাবিলা।

তবে ভোট নিয়ে আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি সংশয়ও কাটছে না ফিলিস্তিনি ভোটারদের। লাইলা আতামনেহের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিকল্প বেছে নেওয়াই বাস্তবতা। তারপরও তাঁর প্রশ্ন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া কি ইসরায়েলকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করছে না?

এই দ্বিধার মধ্যেই ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। তাঁদের কাছে এবারের নির্বাচন কেবল সরকার বেছে নেওয়ার লড়াই নয়; বরং অধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান জানানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন