Thursday, October 22, 2026

ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে মুখোমুখি ট্রাম্প-ম্যাক্রোঁ, উত্তপ্ত ইউরোপের রাজনীতি


ছবিঃ ফ্রান্সের প্যারিসে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে বিক্ষোভকারীরা ল্যুভর জাদুঘরের একটি প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছেন, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ক্রিস্টোফ পেটিট টেসন/ইপিএ)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইউরোপের অভিবাসননীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ ডানপন্থী রাজনীতিকেরা অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকে সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইউরোপ সীমান্ত বন্ধ করে অপরাধীদের বের করে না দিলে মহাদেশটি গুরুতর সংকটের মুখে পড়বে। ফ্রান্স ও ইতালির অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, দেশগুলোতে চলমান পরিস্থিতির পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি নয়, বরং এমন কিছু মানুষের ভূমিকা রয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পরদিন কাতার সফরকালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বিদেশি নেতাদের এমন মন্তব্যকে ‘বোকামিপূর্ণ’ বলে সমালোচনা করেন। ফ্রান্সের অস্থিরতার পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ নেই বলেও জানান তিনি।

ট্রাম্পের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফরাসি শিক্ষার্থীদের একাংশ। প্যারিসের কাছাকাছি এলাকার পল এলুয়ার উচ্চবিদ্যালয়ের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বিলাল নারজিসি বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ভীতি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ডানপন্থীরা নিজেদের কর্মসূচির পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।

নারজিসি বলেন, শিক্ষার্থীদের মূল দাবি নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত। অন্যরা কী বলছেন, সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে আন্দোলনের প্রকৃত বিষয় সামনে রাখাই প্রয়োজন।

ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরাপত্তা অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল দুপুইয়ের মতে, ফ্রান্সের ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন ট্রাম্প। তাঁর ধারণা, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারে ইউরোপের অস্থিরতাকে ব্যবহার করতে চাইছে রিপাবলিকানরা।

সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের বড় একটি অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত কিছু লোক বিভিন্ন শহরের পৌর ভবনে হামলা চালায় এবং দোকানপাটে লুটপাট করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিকে দেশটির অন্যতম সহিংস অস্থিরতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ঘটনায় দুই হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। একই সঙ্গে বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির কয়েকটি শহরে আংশিক ও সাময়িক কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। প্যারিসের কিছু এলাকাও এর আওতায় রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ ভবন, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং শিক্ষকসংকটের মতো সমস্যা থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও পরে এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সামাজিক অসন্তোষের বিষয়গুলোও যুক্ত হয়। ইতালি, আলবেনিয়া ও স্পেনেও একই ধরনের বিক্ষোভ দেখা গেছে।

ফরাসি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত অপরাধ ও অভিবাসনের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করেনি। দেশটির আইনগত কাঠামোয় জাতিগত পরিচয় ও বর্ণভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার হওয়া এবং বিচারের মুখোমুখি ব্যক্তিদের পরিচয়ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশ করা হয় না।

ফ্রান্সের ডানপন্থী নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রত্যাশী মেরিন লে পেনের পাশাপাশি ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শিবিরের নেতারাও সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। তবে সহিংসতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় বা বংশগত উৎসের চেয়ে তাদের সামাজিক সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষক দুপুই।

তিনি বলেন, শুরুতে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নিলেও পরে সংগঠিত সহিংস গোষ্ঠী ও লুটেরারাও যুক্ত হয়। তাদের পূর্বপুরুষ অভিবাসী ছিলেন কি না, সেটি মূল বিষয় নয়। বরং সমাজের সঙ্গে তাদের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

ফ্রান্সের সহিংসতার ঘটনা ইউরোপের অন্যান্য দেশের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ফ্রান্সের অগ্নিকাণ্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করে বলেন, তাঁর দেশের কঠোর অভিবাসননীতির প্রয়োজনীয়তা এখন সবার কাছে স্পষ্ট।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সরাসরি ফ্রান্সের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, তাঁর দেশ অন্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে না এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইউরোপের উদারপন্থী রাজনীতিকদের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বৈচিত্র্য ও মানবিকতার কথা বলে পশ্চিমা উদারপন্থীরা ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের সামাজিক অভিযোজন ও সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি।

নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলন এবং কঠোর অভিবাসননীতির পক্ষে জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে রিপাবলিকান শিবির এমন বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।

সমালোচকদের একাংশের মতে, ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যা থেকে জনমত সরাতেও ট্রাম্প ফ্রান্সের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

তবে ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে অনড়। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যে এক সমাবেশে তিনি আবারও বলেন, ফ্রান্সের পরিস্থিতি মার্কিন ভোটারদের জন্য সতর্কবার্তা। তাঁর দাবি, আসন্ন নির্বাচনে কী ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, তা বুঝতে ফ্রান্সের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেই হবে।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাই শুধু শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক অসন্তোষের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। অভিবাসন, সামাজিক সংহতি, নিরাপত্তা এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিকে ঘিরে নতুন বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে এই ঘটনা।

    

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন