- ২২ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তায়েজে হুতিদের অবরোধ ও সংঘাত তীব্র হওয়ায় সরকারি বাহিনীকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় নারীরা। শুরুতে সম্মুখসারিতে থাকা যোদ্ধাদের জন্য খাবার তৈরি ও সরবরাহের উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতির অবনতিতে এখন অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনার জন্যও অর্থ সংগ্রহ করছেন তাঁরা।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে তায়েজ প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার পর এসব উদ্যোগ বিস্তৃত হতে থাকে। একদিকে সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এতে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা তায়েজ শহরে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
নারী অধিকারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা প্রথমে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের জন্য বিস্কুট ও কুকিজ তৈরি করে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। এর উদ্দেশ্য ছিল অবরুদ্ধ শহর রক্ষায় নিয়োজিত সেনাসদস্য ও সরকারপন্থী প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা। পরে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি অস্ত্র কেনার জন্যও অনুদান সংগ্রহ শুরু হয়।
প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত অধিকারকর্মী আমিরা আল-সাগির বলেন, শহরটি প্রতিদিন গোলাবর্ষণের মুখে পড়ছে এবং সেখানে হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে নারীদের উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ কার্যক্রমের পক্ষে সমর্থন এসেছে।
সংঘাতের বিস্তার এবং আশপাশের কয়েকটি এলাকায় হুতিদের অগ্রগতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনুদান সংগ্রহের ধরনেও পরিবর্তন আসে। কিছু দাতা তাঁদের দেওয়া অর্থের একটি অংশ গোলাবারুদ কেনার কাজে ব্যয় করার শর্ত দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি বাহিনীর যোদ্ধাদের পর্যাপ্ত গোলাবারুদ নেই এমন আলোচনা ও উদ্বেগও এ উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
মানবিক সহায়তাকর্মী হুরিয়া ওয়াবেল আল জাজিরাকে বলেন, তায়েজে অবরোধ আরোপের পর সেখানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষ্য, শহর রক্ষায় লড়াইরত সেনাদের শুধু খাবার ও পোশাক নয়, অস্ত্র দিয়েও সহায়তা করা প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করছেন। অনেক বেসামরিক মানুষও বাহিনীর সঙ্গে থেকে শহর রক্ষায় অংশ নিতে চাইলেও তাঁদের হাতে অস্ত্র নেই।
স্থানীয় অধিকারকর্মী খাদিজা আল-মাজিদিও খাবারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করছেন। তাঁর মতে, শহরের প্রবেশপথগুলোতে অবরোধ জোরদার হওয়ায় বাসিন্দাদের জীবন, নিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা বেড়েছে।
আল-মাজিদি জানান, তিনি তায়েজ শহরের দক্ষিণে অবস্থিত জাবাল সাবির পাহাড়সংলগ্ন সম্মুখসারির এলাকায় এক দিনেই দুইবার গিয়েছিলেন। সেখানে বাহিনীর এক কমান্ডারের কাছে প্রায় তিন হাজার ডলার মূল্যের গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেন। পাশাপাশি শীতের পোশাক, জুতা, খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীও সরবরাহ করা হয়।
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় কাটানোর পর সম্মুখসারিতে যাতায়াতের ভয় অনেকটাই কেটে গেছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, যোদ্ধাদের সাহস ও শহর রক্ষার দৃঢ়তা কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করেছে।
নারীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সংগঠিতভাবেও তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তায়েজের সুপ্রিম কাউন্সিল ফর পপুলার রেজিস্ট্যান্সের নারী বিভাগ গত ৮ অক্টোবর একটি প্রচারাভিযান শুরু করে। এর লক্ষ্য সরকারপন্থী ১০ হাজার যোদ্ধার জন্য রাইফেল ও গোলাবারুদের ব্যবস্থা করা। এ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত ইয়েমেনিদের কাছ থেকেও সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
আল-সাগির ও আল-মাজিদির ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা ইয়েমেনিদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য অনুদান এলেও স্থানীয় বাসিন্দারাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিচ্ছেন। অথচ অবরোধের কারণে তায়েজের বাসিন্দারাই খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে রয়েছেন।
অনুদান সংগ্রহে নারীদের ত্যাগের কয়েকটি ঘটনাও সামনে এসেছে। আল-সাগির জানান, এক নারী তাঁর সেনাবাহিনীতে কর্মরত স্বামীর সহযোদ্ধাদের সহায়তায় নিজের বিয়ের আংটি দান করেছেন। আল-মাজিদিও এমন কয়েকজন নারীর কথা বলেছেন, যাঁরা নিজেদের স্বর্ণালংকার বিক্রি বা দান করে অর্থ সংগ্রহে অংশ নিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, এক নারী তাঁর বাড়িতে এসে ইয়েমেনি ও সৌদি মুদ্রায় ভরা কয়েকটি খাম দিয়ে যান। খামগুলোর ওপর লেখা ছিল, ‘আল্লাহ চাইলে আমরা জয়ী হব। বীরদের জন্য গোলাবারুদ কিনুন।’
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনে কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে সংঘাত কম ছিল। তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে পশ্চিম তায়েজে হুতিদের বড় ধরনের স্থল অভিযান নতুন করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরসহ লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কয়েকটি এলাকায় হুতিরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর তায়েজ প্রাদেশিক রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর দিকে অগ্রসর হয়ে শহরটিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে।
সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালালেও কয়েকটি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। অবরোধের কারণে শহরে মানুষ ও জরুরি পণ্য প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে দেশটির অধিকাংশ নারী সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও তায়েজে তাঁদের সাম্প্রতিক উদ্যোগ মানবিক সহায়তার গণ্ডি ছাড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। শহরটির অবরোধ কত দিন স্থায়ী হবে এবং সংঘাতের পরিণতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলছে এই তৎপরতা।