Wednesday, October 21, 2026

গাজায় খাদ্যসংকট তীব্র, চা-রুটিতে দিন কাটছে বহু পরিবারের


ছবিঃ ৩০ বছর বয়সী হুদা আবু লায়লা জানান, গাজায় নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ঘাটতির মধ্যে তিনি তাঁর পাঁচ মেয়ের জন্য পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। (সংগৃহীত । আবদেলহাকিম আবু রিয়াস/আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় চরম খাদ্যসংকটে পড়েছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে অনেক পরিবারকে শিশুদের পুষ্টিকর খাবারের বদলে চা ও রুটি খাইয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। এতে শিশুদের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

গাজার পশ্চিমাঞ্চলীয় গাজা সিটিতে তাঁবুতে বসবাস করেন ৩০ বছর বয়সী হুদা আবু লায়লা। পাঁচ মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। সন্তানদের বয়স ১৮ মাস থেকে ১০ বছরের মধ্যে। স্বামী যুদ্ধের সময় আহত হওয়ার পর আর কাজ করতে পারছেন না। অন্যের জন্য রুটি তৈরি করে সামান্য আয় করেন হুদা। সেই আয়ে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

আল জাজিরাকে হুদা জানান, চলতি মাসে গাজায় পণ্য প্রবেশ সীমিত হওয়ার পরপরই তাঁদের ওপর সংকটের প্রভাব পড়ে। বাজারে ডিম ও দুধ পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। আবার খাবার মজুত করে রাখার মতো অর্থও তাঁদের নেই। কোনো দিন টিনজাত শিমের সঙ্গে স্থানীয় মসলা কিংবা জাআতার খেয়ে চলতে হয়। খাবারের সংকট বাড়লে চায়ে রুটি ডুবিয়েই সকালের নাশতা সারতে হয়।

সন্তানদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে না পারাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও অবরোধের মধ্যে জীবন কাটানো এই পরিবারটির জন্য সাম্প্রতিক খাদ্যসংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

ইসরায়েল গত ১৪ অক্টোবর গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়। আগে থেকেই উচ্চমূল্যের চাপে থাকা পরিবারগুলো নতুন করে সংকটে পড়ে।

পণ্য প্রবেশ বন্ধের পেছনে ব্যবসায়ীদের প্রতি ট্রাকের জন্য ১০ হাজার ইসরায়েলি শেকেল বা প্রায় ৩ হাজার ২২৫ ডলার পরিশোধের দাবি নিয়ে বিরোধের কথা উঠে আসে। তবে ১৯ অক্টোবর ইসরায়েল জানায়, গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ধীরে ধীরে আবার চালু করা হবে।

গাজায় ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের বিষয়টি সমন্বয়কারী ইসরায়েলি সংস্থা কোঅর্ডিনেশন অব গভর্নমেন্ট অ্যাকটিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ (কোগাট) জানায়, ব্যবসায়ীরা তাদের জানিয়েছেন, হামাস ওই অর্থ পরিশোধের দাবি প্রত্যাহার করেছে। অন্যদিকে হামাসের বক্তব্য, অর্থটি যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার তহবিলে স্বেচ্ছা অনুদান হিসেবে চাওয়া হয়েছিল।

তবে বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ পুনরায় চালুর ঘোষণার মধ্যেও গাজার মানুষের খাদ্যসংকট কাটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার চাপ।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গত ১৯ অক্টোবর জানিয়েছে, অর্থের ঘাটতির কারণে গাজায় খাদ্যসহায়তা কমাতে হয়েছে। সেপ্টেম্বরে সংস্থাটির সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ। অক্টোবরে তা কমিয়ে ১১ লাখে নামানো হয়েছে।

একই সঙ্গে খাদ্যসহায়তার পরিমাণও অর্ধেক করা হয়েছে। আগে পরিবারগুলো দুটি খাদ্য প্যাকেট পেলেও এখন পাচ্ছে একটি প্যাকেট এবং আগের তুলনায় কম পরিমাণ গমের আটা। প্রতিদিন সরবরাহ করা রান্না করা খাবারের সংখ্যাও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামানো হয়েছে।

ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সংকটে রয়েছেন, যা সংকটের পর্যায় বা তার চেয়েও খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে।

২০২৫ সালের আগস্টে গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল। একই বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটে। তবে সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকট ও সহায়তা কমে যাওয়ায় আবারও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

গাজায় বাস্তুচ্যুত আরেক নারী রায়েদা সোবোহ তাঁর নয় সদস্যের পরিবারের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বর্তমানে গাজা সিটিতে বসবাস করছেন তিনি। কয়েক মাস ধরেই তাঁদের পরিবার কমিউনিটি রান্নাঘরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল।

রায়েদা জানান, রান্নাঘরে খাবার পাওয়া গেলে তাঁরা সেখান থেকেই খেয়ে নেন। সাধারণত সকালে চা, দুপুরে কমিউনিটি রান্নাঘরের খাবার এবং রাতে কখনো ফালাফেল, ভাত, ডাল কিংবা পাস্তা খেয়ে দিন কাটে। কিন্তু তাঁর সন্তানদের খাদ্যতালিকা থেকে প্রায় আট মাস ধরে দুধ, মাংস, ডিম ও পনির বাদ পড়েছে। প্রায় এক মাস ধরে সবজিও কিনতে পারেননি তিনি।

তাঁর কথায়, প্রয়োজনীয় জিনিসের বদলে সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু কেনা সম্ভব, সেটুকুই কিনতে হয়। পরিবারের নির্ভরযোগ্য কোনো আয়ের উৎসও নেই। যে এলাকায় তাঁরা থাকেন, সেটি আনুষ্ঠানিক শিবির হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় অন্য কিছু শিবিরের মতো সহায়তার কুপন ও স্বাস্থ্যবিধিসংক্রান্ত সামগ্রীও তাঁরা পান না বলে জানান রায়েদা।

খাদ্যসংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে শিশুদের শরীরে পড়তে শুরু করেছে। হুদা আবু লায়লার ভাষ্য, তাঁর মেয়েদের মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। তারা প্রায়ই মাথা ঘোরা ও ক্লান্তিতে ভোগে। বড় মেয়ে সালমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গাজার আল-রানতিসি হাসপাতালে তার নিয়মিত চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসক মেয়ের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির দিকে আরও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরে গাজায় অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ২ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশুকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ৩৬০ জনের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ছিল। সংস্থাটির ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ৩ হাজার শিশু প্রতি মাসে অপুষ্টির চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছে।

এদিকে আগস্টে প্রকাশিত ইউনিসেফ-সমর্থিত একটি পুষ্টি জরিপে দেখা গেছে, গবেষকদের নাগালের মধ্যে থাকা এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১২ দশমিক ২ শতাংশ খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

গাজা সিটির শিশু বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদ চিকিৎসক মোহাম্মদ বি আলরাঈ সতর্ক করে বলেছেন, খাদ্য সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধ চলতে থাকলে শিশুদের অপুষ্টির ঘটনা আরও বাড়তে পারে। আগের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির তুলনায় কিছু উন্নতি হলেও হাসপাতালগুলোতে এখনো মাঝারি ও গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু আসছে। পাঁচ বছরের কম বয়সীদের পাশাপাশি পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে।

চিকিৎসক আলরাঈর মতে, প্রয়োজনীয় প্রোটিনের অভাবে কিছু শিশুর পা ফুলে যাওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেয়ে শুধু শর্করানির্ভর এক বেলার খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে অনেক পরিবার। ফলে শিশুদের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হচ্ছে।

তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে খাদ্য প্রবেশের সুযোগ থাকলেও অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে এক-দুই মাসের বেশি সময় লাগতে পারে; কিছু ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অপুষ্টির রোগী আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

রায়েদা সোবোহও সন্তানদের দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর ভাষ্য, শিশুরা দিনের বড় অংশ ঘুমিয়ে কাটায়। কোনো সন্তান একবার পানির পাত্র বহন করতে পারলেও দ্বিতীয়বার তা বহন করার শক্তি পায় না। সন্তানদের যথেষ্ট পুষ্টি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন তিনি।

গাজার বহু পরিবারের কাছে এখন প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই বড় লড়াই। বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে বাধা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও আর্থিকভাবে অসহায় পরিবারগুলোর ওপর।

হুদা ও রায়েদার মতো মায়েদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পেলে তাঁদের সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁরা যুদ্ধের অবসান, সীমান্ত দিয়ে পণ্য প্রবেশ স্বাভাবিক করা এবং খাদ্যের দাম কমার প্রত্যাশা করছেন।

রায়েদা সোবোহের ভাষায়, এই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধ হলে, পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং সীমান্ত খুলে দেওয়া হলে খাদ্যের সরবরাহ বাড়বে ও দাম কমবে এমন আশাই করছেন তিনি।

গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু পণ্য প্রবেশ পুনরায় চালু করার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; খাদ্য সরবরাহ, মানবিক সহায়তা এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার ধারাবাহিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে সংকটে থাকা পরিবারগুলোর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন