- ২৭ জুলাই, ২০২৬
PNN ডেস্ক রিপোর্ট
নির্দিষ্ট কোনো মামলা ছাড়া কাউকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’, গ্রেপ্তার কিংবা অন্য কোনোভাবে হয়রানি করা যাবে না—হাইকোর্টের দেওয়া এমন আদেশ আপাতত স্থগিত করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে এ বিষয়ে জারি করা রুল চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ আপাতত কার্যকর থাকছে না এবং বিষয়টি এখন চূড়ান্ত শুনানির জন্য হাইকোর্টে ফিরে যাচ্ছে।
এর আগে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি আদেশে বলেছিলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, শ্যোন অ্যারেস্ট বা অন্য কোনোভাবে হয়রানি করা যাবে না। একইসঙ্গে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে একটি রুলও জারি করেন আদালত।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর বিষয়টি আপিল বিভাগে উঠলে সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের ওই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ স্থগিত করেন এবং জারি করা রুলটি চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেন।
শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের ওই আদেশ বহাল থাকলে তদন্ত সংস্থাগুলোর স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারত।
তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে নতুন তথ্য বা প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন মামলায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ কার্যকর থাকলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ থাকলেও প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণে বাধার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তিনি আরও জানান, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে নতুন একটি মামলায় গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানোর আবেদন বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী রোববার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
শ্যোন অ্যারেস্ট কী?
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrest) বলতে বোঝায়—কোনো ব্যক্তি ইতোমধ্যে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বা আইনগত হেফাজতে থাকলে, পরবর্তীতে অন্য একটি মামলায়ও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আইনি প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ, ওই ব্যক্তিকে নতুন করে শারীরিকভাবে আটক করা হয় না; বরং তিনি যেহেতু আগে থেকেই রাষ্ট্রের হেফাজতে আছেন, তাই নতুন মামলায় তাকে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ হয়। এ প্রক্রিয়াকেই আইনি ভাষায় Shown Arrest বলা হয়।
এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে তদন্তকারী সংস্থাকে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমতি নিতে হয়। আদালত তদন্তের অগ্রগতি, মামলার নথি, প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের অনুমতি ছাড়া কাউকে নতুন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো যায় না।
বাংলাদেশে শ্যোন অ্যারেস্ট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইনি ও মানবাধিকার মহলে আলোচনা রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরপরই অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে অভিযুক্তকে কারাগারে রাখার চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবি, তদন্তে নতুন তথ্য বা নতুন অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে শ্যোন অ্যারেস্ট একটি প্রয়োজনীয় ও বৈধ আইনি ব্যবস্থা, যা গুরুতর অপরাধের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই কারণেই বিষয়টি একদিকে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অপরাধ তদন্তের ক্ষমতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
আপিল বিভাগের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ আপাতত কার্যকর থাকছে না। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টকে জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষ করে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার বা শ্যোন অ্যারেস্টের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত অবস্থান কী হবে।