Sunday, September 20, 2026

গাজার ধ্বংসস্তূপে নতুন স্বপ্নের নির্মাণ, রোবট বানাচ্ছে শিশুরা


ছবিঃ সহজ ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ ও অ্যালার্ম সিস্টেম এবং রোবট তৈরির বিষয়ে শিশুদের জন্য আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রকৌশলী বাহা আল-মাসরি (সংগৃহীত । আল জাজিরা /আইয়াদ আল-কাতরাউই/আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, বিদ্যুৎ সংকট আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতির মধ্যেও প্রযুক্তির স্বপ্ন ছাড়েনি গাজার একদল শিশু। কয়েকটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, কিছু তার আর একটি সাধারণ প্রোগ্রামযোগ্য সার্কিট বোর্ড দিয়েই তারা শিখছে রোবট তৈরি, সেন্সর ব্যবহার ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরির প্রাথমিক কৌশল।

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় ‘দ্য নেক্সট জেন টিম: রাইজিং রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ার প্রজেক্ট’-এর প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে এসব শিক্ষার্থী। সেখানে তাদের শেখানো হচ্ছে রোবটের বিভিন্ন অংশের কার্যপ্রণালি, মোটর ও ড্রাইভ ইউনিটের ব্যবহার, সেন্সর সংযুক্ত করা এবং প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক বিষয়।

প্রশিক্ষকদের লক্ষ্য শুধু শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান দেওয়া নয়। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি গ্যাস লিক বা আগুনের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি আগেভাগে শনাক্ত করা কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে সহায়তার মতো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে আশা করছেন তারা।

১৬ বছর বয়সী হামজা আল-আত্রাশ এই প্রকল্পের একজন শিক্ষার্থী। একটি আরডুইনো নিয়ন্ত্রক এবং হাতে পাওয়া কিছু ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে সে শিখছে কীভাবে সেন্সরের মাধ্যমে সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও রোবটের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

হামজা আল জাজিরাকে বলেন, তাদের শেখার আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। সুযোগ যত সীমিতই হোক, হাতে থাকা সামান্য উপকরণ ব্যবহার করেই তারা নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তার ভাষায়, যন্ত্রপাতির অভাব তাদের থামিয়ে দেয়নি; বরং সীমিত সম্পদ দিয়ে কীভাবে নতুন সমাধান বের করা যায়, সেটিই তাদের শেখাচ্ছে।

তবে শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বড় ধরনের বাস্তব সংকট। যুদ্ধের আগে গাজায় প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিভিন্ন ইনকিউবেটর ছিল। যুদ্ধের কয়েক বছরে এসব অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমস অ্যান্ড রোবোটিকস প্রজেক্ট’-এর প্রশিক্ষণ দলের প্রধান বাহা আল-মাসরি বলেন, যুদ্ধের আগে গাজার প্রযুক্তি ইনকিউবেটরগুলো তরুণদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, কর্মক্ষেত্র ও নতুন ধারণাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়ার সুযোগ দিত।

তার মতে, বর্তমানে সেই পরিবেশ প্রায় ভেঙে পড়েছে। প্রশিক্ষণকেন্দ্র হারিয়েছে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে এবং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা শিক্ষার্থী ও উদ্ভাবকদের সামনে সুযোগও কমে গেছে। তারপরও প্রতিভাবান তরুণদের প্রযুক্তি শেখার আগ্রহ ধরে রাখতে প্রশিক্ষকেরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

গাজার প্রযুক্তি খাতের সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে শিক্ষা অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির। যুদ্ধের সময় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রগুলোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ১৭টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং ৯০ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

সংস্থাটির হিসাবে, একই সময়ে ২০ হাজার ২২৮ শিক্ষার্থী এবং ৮৩০ শিক্ষক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৯৪ জন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও গবেষকও রয়েছেন বলে ওই হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এর প্রভাব আরও গভীর। বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতির কারণে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের আগে তথ্যপ্রযুক্তি ছিল গাজার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতগুলোর একটি। অর্থনীতিবিদ ও ফিলিস্তিনি ইকোনমিস্ট সিন্ডিকেটের বোর্ড সদস্য আহমাদ আবু কামারের মতে, উচ্চ বেকারত্বের বাজারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া তরুণদের জন্য প্রযুক্তি খাত ছিল গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। খাতটির প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যক্রম বিদেশি বাজারনির্ভর ছিল বলেও তিনি জানান।

তবে যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। আবু কামারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে গাজার তথ্যপ্রযুক্তি খাত যুদ্ধের আগের সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশেরও কম পর্যায়ে চলছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করেছে।

শুধু অফিস ও যন্ত্রপাতি ধ্বংস হওয়াই সমস্যা নয়। ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতিও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো কঠিন করে তুলেছে।

কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, সার্ভার, রাউটার, ফাইবার-অপটিক লাইন ও অন্যান্য প্রযুক্তি সরঞ্জামের দামও ব্যাপক বেড়েছে। আমদানি জটিলতার কারণে কিছু সরঞ্জামের দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় ৬০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে বলে আবু কামারের হিসাব।

তার মতে, যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় প্রায় ৩০ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী চাকরি হারিয়েছেন। সামগ্রিক বেকারত্ব প্রায় ৮০ শতাংশ এবং দারিদ্র্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যুদ্ধের আগে গাজায় পাঁচটি প্রধান প্রযুক্তি ইনকিউবেটর শিক্ষার্থী ও নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, কর্মক্ষেত্র এবং প্রযুক্তি ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ দিত। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণেরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গেও যোগাযোগের সুযোগ পেতেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর ইউসিএএস টেকনোলজি ইনকিউবেটর এবং মাআন সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ইনকিউবেটর—এই দুটি প্রতিষ্ঠান আবার কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে তাদের বর্তমান সক্ষমতা যুদ্ধের আগের সময়ের ২০ শতাংশের বেশি নয়।

প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল-তাহরাওয়ির মতে, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সরঞ্জামের ঘাটতির সঙ্গে ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সার্ভার, ইলেকট্রনিক সেবা, ডিজিটাল হিসাব, কার্ড ও ই-কমার্স ব্যবস্থার সঙ্গেও বিদেশি বাজারে যোগাযোগে নানা বাধা তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষ জনশক্তির সংকট। আল-তাহরাওয়ির হিসাবে, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে উচ্চ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের ৮০ শতাংশের বেশি গাজা ছেড়ে চলে গেছেন।

ফলে একদিকে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও রোবট ও প্রযুক্তি শেখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তাদের সামনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের সংকট ক্রমেই বড়

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন