- ০৭ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সাইবার হামলার যুগেও পুরোনো প্রতারণার কৌশলই এখনো সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে হ্যাকারদের কাছে। কর্মীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করে নিজেদের সহকর্মী বা আইটি বিভাগের কর্মী পরিচয় দিয়ে গোপন লগইন তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধীরা। এরপর সেই তথ্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী আর্থিক ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে সংবেদনশীল তথ্য চুরি এবং মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
গুগলের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স টিম প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হ্যাকাররা মূলত ‘ভিশিং’ (Voice Phishing) নামে পরিচিত একটি কৌশল ব্যবহার করছে। এতে তারা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন করে নিজেদের আইটি সহায়তা দলের সদস্য বা প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। পরে ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ করিয়ে ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য এবং মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (MFA) কোড সংগ্রহ করে।
গুগল এই সাইবার হামলার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি গোষ্ঠীকে ফ্যালকন, হেলিক্স, পিংক এবং রিড্যাক্ট নামে শনাক্ত করেছে। গবেষকদের ধারণা, এসব দল সম্ভবত একটি বৃহত্তর সাইবার অপরাধী নেটওয়ার্কের অংশ, যাকে তারা UNC6671 নামে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এসব গোষ্ঠী একই সংগঠনের অংশ, নাকি আলাদা সহযোগী নেটওয়ার্ক—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যদিও গুগল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেনি।
তদন্তে আরও জানা গেছে, তথ্য চুরির পর হ্যাকাররা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে নিজেদের কর্মকাণ্ড প্রকাশ করে এবং চুরি করা তথ্য ফাঁসের হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থ পরিশোধ করলে তথ্য প্রকাশ করা হবে না, অন্যথায় গোপন নথি প্রকাশ্যে আনা হবে।
গুগলের গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এই চক্র শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানই নয়, উৎপাদনশিল্প, রিয়েল এস্টেট, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা, প্রযুক্তি, পরিবহন এবং আতিথেয়তা খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ, বিনিয়োগ বা আইনি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, সেসব সংস্থার গোপন তথ্যের প্রতি হ্যাকারদের আগ্রহ বেশি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠানের সংবেদনশীল ব্যবসায়িক তথ্য ও উচ্চমূল্যের ক্লায়েন্ট ডেটা হাতিয়ে নিতে পারলে মুক্তিপণের পরিমাণও অনেক বেশি আদায় করা সম্ভব হয়।
গুগলের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হ্যাকারদের ব্যবহৃত একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই প্রায় এক কোটি (১০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিটকয়েন জমা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করে থাকে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি একজন কর্মী প্রতারকের ফাঁদে পড়ে নিজের লগইন তথ্য বা নিরাপত্তা কোড স্বেচ্ছায় দিয়ে দেন।
তাদের মতে, অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনকল, সন্দেহজনক লগইন অনুরোধ কিংবা পরিচয় নিশ্চিত না করে কোনো নিরাপত্তা তথ্য শেয়ার না করাই এ ধরনের হামলা থেকে রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।