Wednesday, August 5, 2026

দুই দিনে ১৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, আহত দুই শতাধিক


ছবিঃ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং বহিরাগতদের উপস্থিতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। গত দুই দিনে অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ভাঙচুর ও উত্তেজনার ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন পক্ষের দাবি।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাত থেকে বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, জকসুর নেতাসহ ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। কয়েকটি স্থানে লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া এবং ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ একপর্যায়ে জকসু, ছাত্রশক্তি, ছাত্রদল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনায় রূপ নেয়।

পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে গড়ালে জকসুর ভিপি, জিএস ও এজিএস, ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী, শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৭০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন কয়েকজনের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও জকসু, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রশিবিরের আহত নেতাকর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ করা হয়। এতে হাসপাতালের সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ঢাকা কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ছাত্রশিবিরের একটি আলোচনা সভার প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পোস্টার লাগানো নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ পরে একাধিক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।

ছাত্রশিবিরের দাবি, তাদের অন্তত ২০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদল জানিয়েছে, তাদের সাতজন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত একজনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর লাঠিসোঁটা হাতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে দেখা যায়। এ সময় নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে।

এদিকে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে হলের কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর এবং শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে ফটকে তালা লাগানোর অভিযোগ ওঠে।

ছাত্রশিবিরের দাবি, তাদের অন্তত ২৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদল জানিয়েছে, তাদের ৩০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ করেছে।

রাজধানীর সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটে মঙ্গলবার গভীর রাতে ছাত্রশিবিরের ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে মারধর করে আবাসিক হল থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মেহেদী নামে এক শিবিরকর্মী আহত হন।

ছাত্রদলের দাবি, নাশকতার পরিকল্পনার খবর পেয়ে তারা ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে ছাত্রশিবির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজেও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। কবি নজরুল সরকারি কলেজে অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি বাংলা কলেজেও উত্তেজনা দেখা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ায়।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শনীতে টানানো ছবি নিয়ে বিরোধের জেরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় দফায় দফায় ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন।

পরদিন দুই সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ‘শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস’ লেখা হয়। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।

বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মারধর করে ক্যাম্পাস ও দুটি ছাত্রাবাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। এতে ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

ছাত্রদলের ভাষ্য, শিবির ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করায় তাদের প্রতিরোধ করা হয়েছে। তবে ছাত্রশিবির এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তাদের নেতাকর্মীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়েছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অদম্য জুলাই’ শীর্ষক কর্মসূচির র‍্যালিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বহিরাগতদের অংশগ্রহণের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া বিরোধ একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।

বিভিন্ন পক্ষের দাবি অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মনিরুল ইসলামের পায়ে গুরুতর আঘাত ও রক্তক্ষরণ হয়। পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও শুরুতে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি।

অন্যদিকে বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন আহত হন। সংঘর্ষের পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

সরকারি তিতুমীর কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের একটি অনুষ্ঠানে ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসাইন ও সদস্যসচিব আল নোমান নিরবকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে। আহতদের দাবি, কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডা ছাড়াই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বুধবার সকালে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘জামায়াত ও শিবিরকে মোকাবিলা করার জন্য ছাত্রদলই যথেষ্ট।’ তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রশিবির দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন, হুমকি, মববাজি ও সন্ত্রাসী কায়দায় রাজনীতি করার চেষ্টা করছে।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের নেতাকর্মীদের সংযত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। জুলাই-আগস্টের স্মৃতিবিজড়িত সময়ে কোনো ধরনের উত্তেজনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ দিতে চায় না সংগঠনটি।

অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলায় জড়িত অনেকেই প্রকৃত শিক্ষার্থী নন। ছাত্রদলের বিভিন্ন কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের ছাত্রজীবন অনেক আগেই শেষ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ থেকে বহিরাগত লোক এনে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হামলা চালানো হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

নূরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদলের কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হলে ছাত্রজনতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আবারও হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

সংঘর্ষের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসন ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

শিক্ষাঙ্গনে ধারাবাহিক সংঘর্ষে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং ক্যাম্পাসে নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন