- ০৫ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
প্রায় তিন বছর ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বজনদের অবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছেন গাজার শত শত মানুষ। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) গাজা সিটির সাবরা এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশটির অন্যতম বৃহৎ গণদাফন, যেখানে আবু শারিয়া ও আল-হাসায়না পরিবারের ১১২ সদস্যের মরদেহের অবশেষ দাফন করা হয়।
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির নিচ থেকে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের জন্য এটি ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, তবে সেই বিদায় ছিল একই সঙ্গে গভীর বেদনা ও নতুন করে শোকের অভিজ্ঞতা।
৩৯ বছর বয়সী লারা আবু শারিয়ার কাছে এই দিনটি ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর একটি। আগের রাতে তিনি ঘুমাতে পারেননি। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছিল হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের মুখ। শেষবারের মতো বিদায় জানানোর আগে মোবাইলে সংরক্ষিত ছবি দেখে রাত কাটান তিনি।
লারা বলেন, “আজ মনে হয়েছে যেন প্রথমবারের মতো তাদের হারালাম। এভাবে বিদায় জানানো ছিল নতুন করে শোক অনুভব করার মতো।”
২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর সাবরা এলাকায় আবু শারিয়া পরিবারের বাড়িতে চালানো হামলায় লারা হারান তাঁর ১৪ জন নিকটাত্মীয়কে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তাঁর মা নওয়াল, চার ভাই, চার বোন এবং তাঁদের সন্তানরা।
লারা বলেন, “এক মুহূর্তের মধ্যেই আমার পরিবার হারিয়ে গেল।”
হামলার সময় লারা, তাঁর স্বামী ও পাঁচ সন্তান গাজার দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের নির্দেশে তারা উত্তর গাজা ছেড়ে দক্ষিণে চলে গিয়েছিলেন। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা সাবরাতেই থেকে গিয়েছিলেন।
হামলার খবর পাওয়ার পর বারবার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন লারা। কিন্তু ফোনে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি আশা করছিলেন, হয়তো যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে এমন হচ্ছে। পরে জানতে পারেন, পরিবারের বাড়িটি ধ্বংস হয়েছে এবং সবাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন।
তিনি বলেন, “কখনো কখনো ভাবি, হয়তো কেউ আহত অবস্থায় সাহায্যের অপেক্ষায় ছিল। হয়তো কাউকে বাঁচানো যেত। তাদের শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল ভাবলে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না।”
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ গাজা থেকে সাবরায় ফিরে হামলার স্থান দেখতে যান লারা। তখনো তাঁর মনে আশা ছিল, হয়তো কেউ বেঁচে আছেন। কিন্তু সেখানে তিনি শুধু ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান।
দাফনের কয়েক সপ্তাহ আগে ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স দল সাবরার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িগুলোতে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার পর ১৫৩ জন নিখোঁজের মধ্যে ১১২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, ধ্বংস হওয়া ভবনের নিচে এখনো প্রায় ৮ হাজার মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আজ ফিলিস্তিনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ১১২ শহীদের জানাজা ও দাফন হচ্ছে।”
তবে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাসাল বলেন, “কিছু মরদেহ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে, কিছু ক্ষুদ্র অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকের পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
আবু শারিয়া পরিবারের আরেক সদস্য ৫০ বছর বয়সী আলী আবু শারিয়াও হামলার সময় দক্ষিণ গাজায় ছিলেন। ওই হামলায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর দুই ভাই ও তাঁদের পুরো পরিবারকে।
আলী বলেন, “প্রথমে খবর আসে একটি বাড়িতে হামলা হয়েছে, পরে আরেকটি বাড়িতে। এভাবে একের পর এক খবর আসতে থাকে।”
তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে ছিলেন তাঁর ভাই আহমেদ (৫১) ও মইন (৫৩), তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানরা।
আলীর ভাষ্য, হামলার সময় পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তারা সাবেক ফিলিস্তিনি মন্ত্রী মুফিদ আল-হাসায়নার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও হামলা হয়।
তিনি বলেন, “যুদ্ধের যন্ত্র বেসামরিক মানুষ, বাড়ি কিংবা পরিবার—কাউকেই আলাদা করে দেখেনি।”
আলী জানান, নিহতরা ছিলেন সাধারণ মানুষ—ব্যবসায়ী, দোকানি এবং নিজেদের এলাকায় সক্রিয় নাগরিক। হামলায় সাতটি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
গণদাফনের সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আশপাশের বাড়ির বারান্দা থেকে নারীরা ফুল ছিটিয়ে শেষ বিদায় জানান প্রিয়জনদের।
লারা আবু শারিয়ার জন্য এই দাফন ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ অধ্যায়। কিন্তু তা তাঁর কষ্ট কমাতে পারেনি।
তিনি বলেন, “আমি চেয়েছিলাম ওই ব্যাগটিকে জড়িয়ে ধরতে। তাদের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, সেটুকুই বুকে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।”
স্বজনদের হারানোর শোকের সঙ্গে গাজার হাজারো পরিবারের মতো লারার জীবনেও এখন রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি আর অপেক্ষার ভার।