- ০৫ মার্চ, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
এক বছরের টানা হামলা ও অবরোধে গাজা উপত্যকার অবকাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। যে ব্যবস্থাগুলো আগে কোনোভাবে চাপ সামলে চলছিল, সেগুলো এখন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, সড়ক ও পৌরসেবার মতো মৌলিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গাজাবাসীর দৈনন্দিন জীবন এখন শুধু টিকে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ।
গাজায় এখন পরিবারগুলোর দিন কাটে জেনারেটরের শব্দের ওপর নির্ভর করে যদি জ্বালানি পাওয়া যায়। বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কয়েক লিটার পানির আশায়। অনেক সময় সেই পানিও নিরাপদ নয়। রুটির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
বিদ্যুৎ সংকট সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। গাজার একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, আর বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে রাত নামলেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। শিশুরা মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করে, ফ্রিজ অচল থাকায় খাবার নষ্ট হয়ে যায়, আর মায়েরা সুযোগ পেলেই ফোন চার্জ করে নেন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের আশায়।
পানির অবস্থাও ভয়াবহ। বোমাবর্ষণে নলকূপ, পানি শোধনাগার ও পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি না থাকায় বিশুদ্ধ পানি উত্তোলন ও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক এলাকায় পানি ট্রাকে করে আনা হয়, তবে সেই পানি অনেক সময় লবণাক্ত বা দূষিত থাকে। বাধ্য হয়ে সেই পানি পান করায় শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্যখাত প্রায় ভেঙে পড়েছে। যেসব হাসপাতাল এখনো চালু আছে, সেগুলোতে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও জনবলের তীব্র সংকট। অনেক আইসিইউতে একই বিছানায় দুই রোগীকে রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ডায়ালাইসিস ও অপারেশন চালানো হচ্ছে। কখনো কখনো মোবাইল ফোনের আলো ব্যবহার করে অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
এ ছাড়া সড়ক, ড্রেনেজ ও পৌরসেবার ক্ষতির কারণে গাজার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপে ভরা রাস্তা, উপচে পড়া পয়োনিষ্কাশন, ধীরগতির অ্যাম্বুলেন্স ও ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ বন্ধ থাকায় রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক সময় মানুষ জরুরি সেবা বা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি সরবরাহ হয় না, জ্বালানি না থাকলে হাসপাতাল চলে না, আর সড়ক ভেঙে গেলে ত্রাণ পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। একটির পতন আরেকটির সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে গাজার অবকাঠামো আর স্বাভাবিক জীবনধারণের সহায়ক নয়; বরং কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সহায়তাও দিতে পারছে না। পুনর্গঠনের কথা বলতে গেলে শুধু ভবন নয়, বরং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পুরো ব্যবস্থাকেই নতুন করে দাঁড় করানোর প্রয়োজন রয়েছে নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, কার্যকর হাসপাতাল ও মৌলিক জনসেবা।
ততদিন পর্যন্ত গাজার সাধারণ মানুষ আরেকটি বছর পার করছে অনিশ্চয়তা, সংকট আর সহনশীলতার কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।