- ২০ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
ডেটিং অ্যাপে পরিচয়, সেখান থেকে প্রেম। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। নতুন সংসার ঘিরে ছিল স্বপ্নও। কিন্তু বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ভোপালের শ্বশুরবাড়ি থেকে তৃষা শর্মার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর সেই গল্পের পরিণতি নেয় রহস্যে। আত্মহত্যা, নাকি দীর্ঘদিনের নির্যাতনের চাপে নেওয়া চরম সিদ্ধান্ত তৃষার মৃত্যু ঘিরে এখনো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা।
তৃষা ছিলেন মডেল, অভিনেত্রী ও করপোরেট পেশাজীবী। ২০১২ সালে ‘মিস পুনে’ খেতাব জেতার পর মডেলিংয়ের পাশাপাশি অভিনয়েও কাজ করেন। এমবিএ শেষ করে করপোরেট চাকরির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে হয়।
কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায় বলে দাবি তৃষার পরিবারের।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর তৃষাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। যৌতুকের চাপের অভিযোগও তোলা হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনে তৃষা নিজের দাম্পত্য জীবন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
একপর্যায়ে তিনি মাকে ভোপাল থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।
অন্যদিকে তৃষার শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁর ব্যক্তিগত ও মানসিক সমস্যার কথা সামনে আনা হয়। চিকিৎসা, ওষুধ সেবনসহ তাঁর মানসিক অবস্থার বিষয়ে নানা দাবি করা হয়।
ফলে তদন্তের শুরু থেকেই সামনে আসে দুই পক্ষের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বয়ান।
২০২৬ সালের ১২ মে ভোপালে শ্বশুরবাড়িতে তৃষাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর থেকেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মৃত্যুর আগে তিনি কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, কী বার্তা পাঠিয়েছিলেন, বাড়িতে তখন কারা ছিলেন এবং ঘটনার সময় ঠিক কী হয়েছিল এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত শুরু হয়।
তদন্তে উঠে আসে, মৃত্যুর দিন তৃষা ভোপাল ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। রাজস্থানের নাসিরাবাদে যাওয়ার জন্য তিনি বাবার কাছে টাকা চান এবং ট্রেনের টিকিটও কাটেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে স্বামী সমর্থের সঙ্গে দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে যাওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাতের কথাও তদন্ত নথিতে উঠে এসেছে।
তদন্তে তৃষার মৃত্যুর আগের কয়েক ঘণ্টার ফোনকল ও বার্তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন। একপর্যায়ে মাকে জানান, এই সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় এবং তিনি ভোপাল ছেড়ে চলে যেতে চান।
রাত ৯টার পর ভাবি রাশি আবরোলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর একটি বার্তায় তিনি শান্তিতে থাকতে চাওয়ার কথা জানান।
সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৯টার পর তৃষাকে একা ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর তিনি বাবাকে ফোন করে স্বামীর আচরণ নিয়ে ভয় পাওয়ার কথা জানান এবং দ্রুত বাবা-মাকে আসতে বলেন।
পরে মায়ের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়। এরপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। রাত ১০টার পর পরিবারের সদস্যরা ছাদে যান এবং পরে তৃষাকে নিচে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তৃষার পরিবার প্রথম ময়নাতদন্তের ফল নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না এবং দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের দাবি জানায়। পরে দিল্লির এইমসের বিশেষজ্ঞ বোর্ডের মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ফরেনসিক পরীক্ষায় তৃষার মৃত্যুকে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শরীরে গুরুতর হামলার উল্লেখযোগ্য চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে তদন্তকারীদের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু মৃত্যুর ধরন নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৃষাকে মানসিকভাবে এমন কোনো পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, যা তাঁকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
মামলাটি নিয়ে বিরোধ ও অভিযোগ বাড়তে থাকায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে মামলার তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে যায়।
এরপর তৃষার ফোন, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস, কল রেকর্ড, বার্তা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফরেনসিক তথ্য পরীক্ষা করা শুরু হয়। তাঁর মৃত্যুর আগে ও পরে কার সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হয়।
তদন্তে তৃষার স্বামী সমর্থ সিং ও শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। সিবিআইয়ের অভিযোগের মূল ভিত্তি হত্যা নয়; বরং মানসিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণের মাধ্যমে তৃষাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ।
তবে মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের দোষী বলা যায় না।
তৃষার মৃত্যুর তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এলেও পুরো ঘটনার সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তাঁর আইফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং বাড়ির সিসিটিভি রেকর্ডারের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এখনো তদন্তের অংশ। একই সঙ্গে যৌতুকের অভিযোগের বিষয়টিও আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তৃষার পরিবার একদিকে দাম্পত্য নির্যাতনের অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাঁর মানসিক ও ব্যক্তিগত সমস্যাকে সামনে আনা হয়েছে। আর তদন্তকারীরা খুঁজছেন এই দুই বয়ানের মাঝখানে থাকা প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ।
একজন তরুণী, যিনি বিয়ের কয়েক মাস আগেও ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁর জীবন কীভাবে এমন পরিণতিতে পৌঁছাল তৃষা শর্মার মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে।