- ০২ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
বলিউডের ইতিহাসে কিছু অভিনেতা আছেন, যাঁদের পরিচয় কেবল জনপ্রিয় সিনেমা কিংবা স্মরণীয় চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সঞ্জীব কুমার তাঁদেরই একজন। ‘শোলে’র ঠাকুর বলদেব সিং, ‘কোশিশ’-এর হরি, ‘আঁধি’র জে কে কিংবা ‘মৌসম’-এর অমর বিভিন্ন চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।
তবে পর্দার এই তারকার শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক সংকট, অনিশ্চিত কর্মজীবন আর সীমিত সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি। এমন সময়ও গেছে, যখন তাঁর কাছে পরার মতো ছিল মাত্র দুই সেট পোশাক।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্র সাংবাদিক হানিফ জাভেরির বক্তব্যে উঠে এসেছে সঞ্জীব কুমারের জীবনের এমন কিছু দিক, যা তাঁর অভিনয় প্রতিভার বাইরের মানুষটিকেও নতুন করে চিনতে সাহায্য করে।
সঞ্জীব কুমারের প্রকৃত নাম হরিহর জেঠালাল জারিওয়ালা। গুজরাটি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতার ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। কিন্তু অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় পরিবারকে মোকাবিলা করতে হয়েছে আর্থিক সংকটের।
মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করার সময় তাঁর পরিবারের ব্যবসায়ও দুরবস্থা চলছিল। ফলে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি অর্থের প্রয়োজনও ছিল তাঁর সামনে।
হানিফ জাভেরির ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় সঞ্জীবের পোশাকের সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। মাত্র দুই সেট জামাকাপড় নিয়েই তিনি কাজের সন্ধানে ঘুরতেন।
শুরুতে বড় ব্যানারের সিনেমায় সুযোগ না পেয়ে তুলনামূলক নিম্ন বাজেটের ছবিতে অভিনয় করতে হয়েছে তাঁকে। এসব ছবির কিছু পরে ‘সি গ্রেড’ সিনেমা হিসেবে পরিচিত হলেও তখন সঞ্জীব ছবির শ্রেণি নিয়ে ভাবার অবস্থায় ছিলেন না। তাঁর কাছে মূল বিষয় ছিল কাজ পাওয়া এবং পরিবারের জন্য আয় করা।
সেই কঠিন সময় পেরিয়ে ধীরে ধীরে পরিচালকদের নজরে আসেন তিনি। স্বাভাবিক অভিনয়, সংলাপ উপস্থাপনের নিজস্ব ধরন এবং চরিত্রের আবেগকে ধারণ করার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়।
ষাটের দশকের শেষদিকে সঞ্জীব কুমারের ক্যারিয়ারে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এরপর ‘খিলোনা’, ‘দস্তক’, ‘কোশিশ’, ‘মৌসম’, ‘আঁধি’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘শোলে’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
‘শোলে’তে ঠাকুর বলদেব সিংয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে দর্শকপ্রিয় হয়। সংলাপ তুলনামূলক কম হলেও চরিত্রটির উপস্থিতি পুরো সিনেমাজুড়ে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ‘কোশিশ’-এ শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী এক ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়ক্ষমতার আরেকটি দিক দেখান তিনি। সংলাপের ওপর নির্ভর না করেও মুখভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে দর্শকের কাছে চরিত্রের অনুভূতি পৌঁছে দেন সঞ্জীব।
‘দস্তক’ ও ‘কোশিশ’-এর জন্য জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। বাণিজ্যিক সিনেমার দর্শক থেকে চলচ্চিত্র সমালোচক দুই মহলেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন এই অভিনেতা।
সঞ্জীব কুমারকে নিয়ে বলিউডে একসময় ধারণা ছিল, তিনি নাকি অর্থ খরচের ব্যাপারে বেশ হিসাবি। তবে হানিফ জাভেরির বক্তব্যে তাঁর অন্য একটি চিত্র পাওয়া যায়।
হানিফের দাবি, নিজের অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চললেও অন্যের প্রয়োজনের সময় সঞ্জীব কখনো কার্পণ্য করতেন না। বন্ধুদের প্রয়োজনে তিনি বিপুল অর্থ ধার দিয়েছিলেন, যার বড় অংশ পরবর্তীতে ফেরতও পাননি।
সব মিলিয়ে প্রায় ৯৬ লাখ রুপি তিনি বন্ধুদের ধার দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন হানিফ। এসব অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো লিখিত চুক্তি বা আইনি নিশ্চয়তাও নিতেন না সঞ্জীব।
সঞ্জীব কুমারের উদারতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে আসে অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহার প্রসঙ্গ।
ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে বের হওয়ার পর শত্রুঘ্ন সিনহা যখন বলিউডে নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর আর্থিক সংকট চলছিল। হানিফের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় বন্ধুর পাশে দাঁড়ান সঞ্জীব।
শত্রুঘ্নকে তিনি প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ রুপি দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থ সহায়তার পাশাপাশি নতুন অভিনেতা শত্রুঘ্নের হয়ে প্রযোজকদের সঙ্গেও কথা বলতেন সঞ্জীব।
অর্থাৎ বন্ধুর ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাঁর পেশাগত পথও সহজ করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
প্রযোজক বনি কাপুরও একসময় সঞ্জীব কুমারের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন হানিফ জাভেরি। তাঁর দাবি, সঞ্জীব এ ক্ষেত্রেও কোনো কাগজপত্র ছাড়াই টাকা দিয়েছিলেন।
পরে সঞ্জীবের মৃত্যুর পর বনি কাপুর সেই অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দেন বলে জানা যায়। এমনকি সঞ্জীবের পরিবারও জানত না যে তিনি বনি কাপুরকে অর্থ দিয়েছিলেন।
এই ঘটনাকে সঞ্জীবের স্বভাবের একটি দিক হিসেবে দেখিয়েছেন হানিফ তিনি কাউকে সাহায্য করলে তা নিয়ে প্রচার করতেন না।
শুধু তারকা বন্ধুদের নয়, নিজের সঙ্গে কাজ করা মানুষদের প্রতিও সঞ্জীবের ছিল বিশেষ টান।
হানিফের তথ্য অনুযায়ী, নিজের গাড়িচালকের বিয়ের খরচও বহন করেছিলেন সঞ্জীব। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর আগে উইলে ওই চালকের ছেলের পড়াশোনার জন্য দুই লাখ রুপি রেখে যাওয়ার কথাও জানা যায়।
খ্যাতি ও অর্থের দিক থেকে তিনি তখন বলিউডের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কাজ করা একজন কর্মীর পরিবারের ভবিষ্যতের কথাও তিনি ভাবতেন এই ঘটনাটি তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি মানবিক দিক তুলে ধরে।
সঞ্জীব কুমারের ব্যক্তিজীবনও ছিল নানা আলোচনায় ভরা। হেমা মালিনী ও নূতনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বলিউডে আলোচনা হয়েছে। তবে অভিনেত্রী ও গায়িকা সুলক্ষণা পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে আলোচিত।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সুলক্ষণা পণ্ডিত তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সঞ্জীব সেই সিদ্ধান্তে রাজি হননি।
হানিফ জাভেরির দাবি, এর পেছনে ছিল সঞ্জীবের নিজের জীবন নিয়ে গভীর এক আশঙ্কা। তাঁর পরিবারের কয়েকজন পুরুষ সদস্য ৫০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই মারা গিয়েছিলেন। এ কারণে সঞ্জীবের ধারণা ছিল, তাঁর জীবনও হয়তো দীর্ঘ হবে না।
এর মধ্যে তিনি দুবার হৃদ্রোগে আক্রান্তও হয়েছিলেন। ফলে বিয়ে করে কোনো নারীর জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে চাননি হানিফের বক্তব্যে এমন কারণই উঠে এসেছে।
সঞ্জীব কুমারের আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত অনেকটাই বাস্তব হয়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালের ৬ নভেম্বর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
জীবনের শেষদিকে তিনি বলিউডের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। অথচ শুরুতে ছিল অনিশ্চয়তা, অভাব আর কাজের জন্য সংগ্রাম।
মাত্র দুই সেট পোশাক নিয়ে মুম্বাইয়ে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখা সেই তরুণ একসময় হয়ে ওঠেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় অভিনেতা। পুরস্কার, জনপ্রিয়তা ও অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র তাঁকে ইতিহাসে জায়গা দিয়েছে। তবে তাঁর জীবনের আরেকটি দিকও সমানভাবে আলোচনার দাবি রাখে অর্থ হাতে এসেও তিনি তা শুধু নিজের জন্য জমিয়ে রাখেননি।
বন্ধুর বিপদে অর্থ দিয়েছেন, সহকর্মীর পরিবারকে সাহায্য করেছেন, নতুন অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনেক সময় সেই সাহায্যের কথাও কাউকে জানাননি।
সঞ্জীব কুমারের অভিনয় তাই শুধু পর্দার চরিত্রে আটকে নেই। তাঁর জীবনকাহিনিতে আছে সংগ্রাম থেকে সাফল্যে ওঠার গল্প, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প এবং ব্যক্তিগত কিছু অপূর্ণতার গল্প। এ কারণেই মৃত্যুর চার দশক পরও বলিউডের দর্শকের কাছে তাঁর নাম কেবল একজন অভিনেতার নাম নয় এটি এক গভীর অভিনয়-উত্তরাধিকারের পরিচয়।