- ০৪ অক্টোবর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
হলিউডে কিছু চরিত্র অভিনেতার ক্যারিয়ারের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে পরবর্তী কাজগুলোতেও দর্শকের চোখে সেই চরিত্রের ছাপ থেকে যায়। ডাকোটা জনসনের ক্যারিয়ারেও এমন অভিজ্ঞতা এসেছে। ‘ফিফটি শেডস অব গ্রে’ তাঁকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দিলেও, সেই সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিতর্ক, অন্তরঙ্গ দৃশ্য এবং ব্যক্তিজীবন নিয়ে বাড়তি আগ্রহ।
৪ অক্টোবর ৩৭ বছরে পা দিয়েছেন এই মার্কিন অভিনেত্রী। তবে গত এক দশকে ডাকোটা শুধু ‘ফিফটি শেডস’–এর আনাস্তাসিয়া স্টিল হিসেবে নিজেকে আটকে রাখেননি। বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি স্বাধীন ধারার ছবিতে অভিনয় করেছেন, আবার প্রযোজক হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
১৯৮৯ সালের ৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিনে জন্ম ডাকোটা মাইয়া জনসনের। বাবা অভিনেতা ডন জনসন এবং মা অভিনেত্রী মেলানি গ্রিফিথ। তাঁর নানি টিপ্পি হেড্রেনও হলিউডের পরিচিত মুখ। ফলে চলচ্চিত্রের পরিবেশ তাঁর শৈশব থেকেই পরিচিত ছিল।
মাত্র ৯ বছর বয়সে মায়ের অভিনীত ‘ক্রেজি ইন আলাবামা’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে পর্দায় অভিষেক হয় ডাকোটার। এরপর ছোট-বড় বিভিন্ন চরিত্রে কাজ করলেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি বড় তারকা হিসেবে পরিচিতি পাননি।
২০১০ সালে ডেভিড ফিঞ্চারের ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমা ও টেলিভিশন প্রযোজনায় দেখা যায় তাঁকে। ‘২১ জাম্প স্ট্রিট’, ‘দ্য ফাইভ-ইয়ার এনগেজমেন্ট’ ও ‘বেন অ্যান্ড কেট’ এর মতো কাজও করেন। কিন্তু ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে ২০১৫ সালে।
ই এল জেমসের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘ফিফটি শেডস অব গ্রে’ মুক্তির আগেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ছবিতে আনাস্তাসিয়া স্টিল চরিত্রে অভিনয় করেন ডাকোটা, আর তাঁর বিপরীতে ছিলেন জেমি ডরনান।
প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্ক, যৌনতা, নগ্নতা ও ক্ষমতার জটিল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল অন্তরঙ্গ দৃশ্য। এসব দৃশ্যে অভিনয় করা ডাকোটার জন্যও ছিল বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
পরবর্তী সময়ে তিনি জানিয়েছেন, শুটিংয়ের সময় ব্যক্তিগত পরিসর ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল। সীমিতসংখ্যক মানুষকে সেটে রাখা হতো, যাতে অভিনয়শিল্পীরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারেন। চরিত্রটির জন্য শারীরিক প্রস্তুতিও নিতে হয়েছিল তাঁকে।
তবে ছবিটি তাঁকে শুধু আলোচনায় আনেনি, বক্স অফিসেও বড় সাফল্য এনে দেয়। প্রায় ৪ কোটি ডলার বাজেটের ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলার আয় করে।
‘ফিফটি শেডস অব গ্রে’ এর সাফল্যের পর আনাস্তাসিয়া স্টিল চরিত্রে আরও দুইবার পর্দায় ফেরেন ডাকোটা। ‘ফিফটি শেডস ডার্কার’ এবং ‘ফিফটি শেডস ফ্রিড’ও ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম ছবির তুলনায় পরবর্তী কিস্তিগুলোতে তাঁর পারিশ্রমিকও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
তবে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে পাওয়া পরিচিতিকে নিজের একমাত্র পরিচয় হতে দেননি ডাকোটা। বরং এরপর তিনি বেছে নিতে শুরু করেন ভিন্ন স্বাদের চরিত্র।
‘আ বিগার স্প্ল্যাশ’, ‘ব্যাড টাইমস অ্যাট দ্য এল রয়্যাল’, ‘সাসপিরিয়া’ এবং ‘দ্য পিনাট বাটার ফ্যালকন’ এর মতো সিনেমায় কাজ করে নিজের অভিনয়ের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। বিশেষ করে ‘সাসপিরিয়া’ তাঁকে আগের রোমান্টিক ইমেজের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখার সুযোগ করে দেয়।
যে সিনেমা ডাকোটাকে আন্তর্জাতিক তারকা বানিয়েছিল, সেই ফ্র্যাঞ্চাইজির নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সবসময় ইতিবাচক ছিল না। ২০২২ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সিনেমাটি নিয়ে তাঁর প্রাথমিক ধারণা এবং শেষ পর্যন্ত পর্দায় যে কাজটি এসেছে, তার মধ্যে পার্থক্য ছিল।
নির্মাণের সময় সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নিয়ে জটিলতা এবং মানসিক চাপের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে একই সঙ্গে এ কথাও স্পষ্ট যে, ‘ফিফটি শেডস’ তাঁকে পরবর্তী সময়ে নিজের পছন্দের কাজ বেছে নেওয়ার শক্ত অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।
ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ে ডাকোটা শুধু ক্যামেরার সামনে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। প্রযোজক রো ডনেলির সঙ্গে গড়ে তোলেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টি টাইম পিকচার্স।
২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি বোট রকারের সঙ্গে ফার্স্ট লুক চুক্তিতে যায়। এরপর ‘চা চা রিয়েল স্মুথ’, ‘অ্যাম আই ওকে?’ ও ‘ড্যাডিও’সহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পে প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করেন ডাকোটা। ‘ড্যাডিও’তে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
এভাবে ধীরে ধীরে নিজের ক্যারিয়ারের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণও বাড়িয়েছেন এই অভিনেত্রী। শুধু কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন তা নয়, কোন ধরনের গল্প পর্দায় আসবে সেই সিদ্ধান্তেও অংশ নেওয়ার জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।
তবে সব সিদ্ধান্ত যে সফল হয়েছে, তা নয়। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া সুপারহিরো সিনেমা ‘ম্যাডাম ওয়েব’ ছিল ডাকোটার ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত ব্যর্থতা। ছবিতে ক্যাসান্দ্রা ওয়েব চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
বড় বাজেটের এই সিনেমাটি সমালোচকদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায় এবং প্রত্যাশিত ব্যবসাও করতে পারেনি। বিশ্বব্যাপী ছবিটির আয় প্রায় ১০ কোটি ৫ লাখ ডলারে সীমাবদ্ধ থাকে।
পরবর্তী সময়ে ডাকোটা সিনেমাটির ব্যর্থতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বড় স্টুডিওর ছবিতে অনেক সময় সৃজনশীল সিদ্ধান্ত একাধিক স্তরে নেওয়া হয়। ফলে শুরুতে যে পরিকল্পনা থাকে, শেষ পর্যন্ত নির্মিত সিনেমা সেটি থেকে অনেকটাই ভিন্ন হয়ে যেতে পারে।
তারকাখ্যাতির কারণে ডাকোটার ব্যক্তিজীবন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ রয়েছে। কোল্ডপ্লে তারকা ক্রিস মার্টিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বহুবার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ্যে আনার ক্ষেত্রে ডাকোটা বরাবরই সতর্ক।
সাম্প্রতিক সময়েও নিজের ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে তিনি স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, জনপ্রিয় অভিনেত্রী হওয়া মানেই জীবনের প্রতিটি বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরা নয়। ক্যামেরার বাইরে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে রাখার চেষ্টা করেন তিনি।
এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘ভেরিটি’। কোলিন হুভারের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় ডাকোটার সঙ্গে অভিনয় করেছেন অ্যান হ্যাথাওয়ে ও জশ হার্টনেট।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ড-সম্পৃক্ততা থেকেও আয় করেন ডাকোটা। সেলিব্রিটি নেট ওয়েথের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা।
একসময় ‘ফিফটি শেডস’–এর একটি চরিত্রের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত হওয়া ডাকোটা জনসন এখন সেই পরিচয়ের বাইরে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। অভিনয়, প্রযোজনা এবং নিজের পছন্দের গল্প বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার এখন আর শুধু একটি জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজির ওপর নির্ভরশীল নয়।