- ১৯ জুলাই, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান মুনশট এআই। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি তাদের নতুন ওপেন সোর্স ভাষা মডেল ‘কিমি কে৩’ (Kimi K3) উন্মুক্ত করেছে। উন্নত সক্ষমতার দাবি নিয়ে আসা এই মডেল প্রযুক্তি অঙ্গনে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই প্রতিযোগিতা এবং ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মুনশট এআই জানিয়েছে, তাদের নতুন মডেলটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক এআই মডেলগুলোর চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও, বিভিন্ন মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ফলাফল দেখিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কিমি কে৩ একাধিক মূল্যায়নে অত্যাধুনিক ওপেন সোর্স মডেলগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স করেছে।
স্বাধীন মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি পরীক্ষাতেও কিমি কে৩-এর সক্ষমতা ইতিবাচকভাবে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বর্তমানে বাজারে থাকা শীর্ষস্থানীয় এআই মডেলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে।
নতুন মডেল ঘোষণার সময়টি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব এআই সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্যের সঙ্গে প্রায় একই সময়ে কিমি কে৩-এর ঘোষণা আসে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি খাতে কিছুটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ওয়াল স্ট্রিটে বিশেষ করে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বিক্রির চাপ বাড়ে। ফলে নাসডাক সূচক প্রায় এক শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ওপেন সোর্স এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কিমি কে৩-এর আগমন অনেকটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ২০২৫ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিক তাদের ওপেন সোর্স আর১ মডেল উন্মুক্ত করার সময়কার পরিস্থিতিকে। তবে এবার বিতর্ক আরও তীব্র, কারণ এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ আরও বেড়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের সাবেক এআই নীতিনির্ধারক ডেভিড স্যাকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন নতুন ডেটা সেন্টার, এআই নিয়ন্ত্রণ এবং জটিল নীতিমালায় ব্যস্ত, তখন চীন দ্রুতগতিতে উন্নত এআই প্রযুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে দিতে পারে।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন উবারের সাবেক প্রধান নির্বাহী ট্রাভিস কালানিকও। তিনি অভিযোগ করেন, চীনা মডেলগুলো পশ্চিমা এআই মডেলের আউটপুট ব্যবহার করে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। যদিও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমা অনেক এআই মডেলও উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে চীনা প্রযুক্তি থেকে শিক্ষা নিয়েছে।
ওপেনএআইয়ের কৌশলগত ভবিষ্যৎ বিভাগের প্রধান ডিন বল কিমি কে৩-কে একটি শক্তিশালী মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, মডেলটির সাফল্যকে শুধু অন্য মডেলের আউটপুট ব্যবহার বা তথাকথিত ‘ডিস্টিলেশন’-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। তবে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এত উন্নত একটি ওপেন সোর্স মডেল প্রকাশে চীনের সরকারের অনুমতি দীর্ঘমেয়াদে কতটা অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রকাশনা ট্রান্সফরমার-এর সম্পাদক শাকিল হাশিম ভিন্ন মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, কিমি কে৩ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের প্রয়োজন নেই। কারণ বর্তমান পর্যায়ে মডেলটির এমন কোনো সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে যদি আরও শক্তিশালী মডেল তৈরি হয়, তাহলে চীনও অন্যান্য দেশের মতো একই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিমি কে৩ শুধু আরেকটি নতুন এআই মডেল নয়; এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ওপেন সোর্স এআই কতটা উন্মুক্ত থাকবে, এর ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কোন দিকে যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের এআই শিল্পের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
বিশ্বজুড়ে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতি, গবেষণা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে, তখন কিমি কে৩-এর মতো নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব শুধু প্রযুক্তি খাতেই নয়, আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।