Monday, October 19, 2026

যুদ্ধ, বন্দর ও বিনিয়োগ: হর্ন অব আফ্রিকায় যুক্তরাজ্যের নীরব কূটনীতি


ছবিঃ সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা সমুদ্রবন্দরে নোঙর করা একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করছেন শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২। (সংগৃহীত । আল জাজিরা । ব্রায়ান ইনগাঙ্গা / এপি ছবি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

সুদানের গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে বারবার বেসামরিক হতাহত ও মানবিক বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে যুক্তরাজ্য সরকার। গত ডিসেম্বরেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জবাবদিহির আহ্বান জানায় এবং সহিংসতা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো বলছে, বাস্তবে লন্ডন আরও কার্যকর ও কঠোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, এমন সময় যখন সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান শুধু সুদানে নয়, পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে যুক্তরাজ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর সংঘর্ষে যখন দারফুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যার অভিযোগ উঠছে, তখন যুক্তরাজ্যের ‘সর্বনিম্ন উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ কূটনৈতিক কৌশল আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সুদানের নীতিবিশেষজ্ঞ আমগাদ ফারিদ এলতায়েব মনে করেন, যুক্তরাজ্য এখন এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তার বক্তব্য ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে ফারাক স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, “যখন কোনো দেশের কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকে না, তখন তাকে আর নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হয় না, বরং স্বার্থ রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।”

বিশ্লেষকদের দাবি, আরএসএফকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সহায়তা করছে—এমন অভিযোগ জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এলেও লন্ডনের অবস্থান তুলনামূলক নীরব। এ কারণেই কেউ কেউ যুক্তরাজ্যকে পরোক্ষভাবে এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘হালকা করে দেখানোর’ সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

অবশ্য যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সুদানের পরিস্থিতি সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। তারা মিত্রদের সঙ্গে কাজ করে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং বেসামরিক সরকারের পথে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়।

সুদানের পাশাপাশি সোমালিয়া ও সোমালিল্যান্ড ইস্যুতেও যুক্তরাজ্যের ভূমিকা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে লন্ডন আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে স্বীকৃতি না দেওয়া সত্ত্বেও বিচ্ছিন্নতাবাদী সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা বন্দরে আর্থিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে রেখেছে।

ব্রিটিশ সরকারের উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট (বিআইআই) ওই বন্দরটির অংশীদার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং সোমালিল্যান্ড প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত এই বন্দরটি লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে অবস্থিত, যা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেরবেরা কেবল একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়; এটি নিরাপত্তা, প্রভাব ও কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ফলে সেখানে বিনিয়োগ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, চাইলেও একে নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখানো কঠিন।

হর্ন অব আফ্রিকা বিষয়ক বিশ্লেষক আবদালফতাহ হামেদ আলীর মতে, যুক্তরাজ্যের এই ‘দ্বিমুখী কৌশল’ স্বল্পমেয়াদে প্রভাব ধরে রাখতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। তাঁর ভাষায়, “এই অঞ্চলে অস্পষ্ট অবস্থান দ্রুতই দায়ে পরিণত হতে পারে। স্থানীয় পক্ষগুলো যদি মনে করে আপনার স্বার্থ অন্যখানে, তাহলে রাজনৈতিক সমঝোতায় চাপ দেওয়ার নৈতিক শক্তি হারাতে হয়।”

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষক ম্যাথিউ স্টার্লিং বেনসন বলেন, বড় অবকাঠামো বিনিয়োগ স্থানীয় রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এতে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি দুর্বল হয় এবং বহিরাগত শক্তি সরাসরি রাজনৈতিক দায় না নিয়েই প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুদান ও সোমালিল্যান্ড—দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের নীতি আসলে একই ধাঁচের: কৌশলগত প্রবেশাধিকার ও অংশীদারিত্ব বজায় রাখা, কিন্তু এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে যাওয়া যা তার কূটনৈতিক চলাচলের পরিসর সংকুচিত করতে পারে। তবে এই কৌশলই এখন অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাজ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন