Saturday, July 25, 2026

ইয়েমেনের তাইজ শহরে এখনো স্নাইপারের আতঙ্কে কাটছে হাজারো পরিবারের জীবন


ছবিঃ তাইজ শহরের সম্মুখসারির কাছে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, যা এমন আরেকটি ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে এখনও মানুষ বসবাস করছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের তীব্রতা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে ইয়েমেনের তাইজ শহরের সামনের সারির (ফ্রন্টলাইন) এলাকাগুলোতে এখনও প্রতিদিনের জীবন মানেই অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার লড়াই। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব ও বাড়তি ভাড়ার চাপে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এমনসব এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে একটি ভুল পদক্ষেপই মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তাইজ শহরের একটি ফ্রন্টলাইন এলাকার বাসিন্দা ‘উম ইউসুফ’ নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে এমনই একজন সংগ্রামী নারী। চল্লিশোর্ধ্ব এই একক মা চার সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজেছেন। স্বামী বহু বছর আগে বিদেশে কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়ার পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে ওঠেন তিনি।

কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও আবাসন সংকটের কারণে শহরের নিরাপদ এলাকায় তিন কক্ষের একটি বাড়ির ভাড়া তার নাগালের বাইরে চলে যায়। দীর্ঘ আট মাস নানা জায়গায় ঘুরেও সাশ্রয়ী বাসা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ফ্রন্টলাইনের কাছাকাছি একটি বাড়িতে ওঠেন, যেখানে মাসিক ভাড়া ছিল মাত্র ১৩ ডলার।

কিন্তু স্বল্প ভাড়ার সেই সিদ্ধান্ত খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ বাস্তবতায় রূপ নেয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নতুন বাসায় ওঠার মাত্র দুই মাস পর একদিন বাইরে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় উম ইউসুফের ১১ বছর বয়সী ছেলে। শিশুটি মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে ঝরতে বাড়িতে ফিরে আসে।

উম ইউসুফ বলেন, কোনো গুলির শব্দই তিনি শুনতে পাননি। পরে ধারণা করা হয়, দূর থেকে ছোড়া স্নাইপারের গুলিতেই আহত হয়েছিল তার সন্তান।

দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা শিশুটির প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হন। পরদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলেও সেই ঘটনার পর পুরো পরিবার বুঝতে পারে, তারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে।

তবুও অন্য কোথাও চলে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই।

উম ইউসুফ জানান, এলাকার মানুষ প্রতিদিন নিজেদের নিরাপদ রাখতে নানা কৌশল অনুসরণ করেন। রাত হলে দূর থেকে দেখা যায় এমন ঘরের বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শিশুদের খোলা জায়গায় খেলতে দেওয়া হয় না; বাড়ির আড়ালে সীমিত জায়গায় খেলতে হয়।

তিনি বলেন, আগে এসব বিষয়ে কিছুই জানতেন না। এখন সন্তানদের নিরাপদ রাখতে স্থানীয়দের মতো তিনিও একই নিয়ম মেনে চলছেন।

জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে ইয়েমেনে স্নাইপারের গুলিতে আহত বা নিহত হওয়া বেসামরিক মানুষের ৬৬ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে তাইজে। নথিভুক্ত ২১টি ঘটনার মধ্যে নয়জনই ছিল শিশু।

বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ঘেরা শহর হওয়ায় তাইজের ভৌগোলিক অবস্থান স্নাইপারদের জন্য অনুকূল। শহরের বিভিন্ন উঁচু স্থান থেকে সহজেই জনবসতি লক্ষ্য করা যায়, যা বেসামরিক মানুষের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

তাইজ গভর্নরেটের স্থানীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের পরিচালক খালিদ আলওয়ান জানান, সংঘাতের কারণে এলাকায় ১০ হাজারের বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরও বহু ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার তথ্য এখনও তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তার ভাষ্য, নিরাপদ এলাকায় অনেক বাড়ি থাকলেও অধিকাংশ পরিবার সেগুলো সংস্কারের খরচ বহন করতে পারছে না। ফলে বাসযোগ্য বাড়ির সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

কিছু মানবিক সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি সংস্কারের কাজ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় সেই উদ্যোগ খুবই সীমিত। নাহদা মেকার্স অর্গানাইজেশন (এনএমও) ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার বাড়ি পুনর্বাসন করা হয়েছে। তবে দেশজুড়ে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের তুলনায় এই সংখ্যা এখনও খুবই কম।

তাইজের আল-থাওরাহ এলাকায় বসবাসকারী ৫৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাঈদও যুদ্ধের বাস্তবতার আরেকটি মুখ।

চাকরি না থাকায় তিনি ভাড়া দিতে পারেন না। তাই একটি পরিত্যক্ত বাড়ি পাহারা দেওয়ার বিনিময়ে পরিবার নিয়ে সেখানে বিনা ভাড়ায় থাকছেন।

তিনি বলেন, প্রায়ই রাতে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। শুরুতে সন্তানরা আতঙ্কে কেঁদে উঠত। এখন তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে কিন্তু এটি এমন এক অভ্যাস, যা কোনো শিশুর জীবনের অংশ হওয়া উচিত নয়।

অন্যদিকে খালিদ আবদুলহাদি নামে এক হিসাবরক্ষক যুদ্ধ শুরুর পর নিজের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ এলাকায় চলে যান। এখনও তিনি ভাড়া বাসায় থাকেন, যদিও তাইজে তার নিজের বাড়ি রয়েছে।

তিনি জানান, প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে গিয়ে স্নাইপারের গুলিতে স্বজন হারিয়েছেন। তাই নিজের বাড়ি ফাঁকা রেখেও সেখানে আর ফিরতে চান না।

বরং দরিদ্র একটি পরিবারকে বিনা ভাড়ায় বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন, যাতে তারা বাড়িটি দেখাশোনা করতে পারে।

তার কথায়, "যুদ্ধ আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। এখন সবচেয়ে মূল্যবান হলো জীবন। সেটিকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।"

দীর্ঘদিনের সংঘাতে বিধ্বস্ত ইয়েমেনে যুদ্ধের গতি কমলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা এখনও কাটেনি। তাইজের অসংখ্য পরিবার প্রতিদিন মৃত্যুভয়ের সঙ্গে বসবাস করছে যেখানে নিরাপদ একটি ঘর আজ শুধু আশ্রয় নয়, বরং বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন