Saturday, October 3, 2026

ভোলার গ্যাসে নতুন সম্ভাবনা, গ্রিডে যুক্ত করতে বড় হচ্ছে উদ্যোগ


ছবিঃ ভোলার গ্যাস (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ভোলা

দেশে গ্যাসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নির্ভরতা। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার বাইরে থাকা ভোলার বিপুল গ্যাসসম্পদকে কাজে লাগানোর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ভোলায় গ্যাসের মজুত থাকলেও প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামোর অভাবে এর বড় একটি অংশ এখনো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সংকট যখন উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করছে, তখন ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস দ্রুত কাজে লাগানোকে সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা—এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ১ দশমিক ৪৩২ থেকে ১ দশমিক ৪৩৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলনযোগ্য।

দেশে বর্তমানে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ। সেই হিসাবে ভোলাতেই দেশের মোট অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় ১৯ শতাংশ রয়েছে।

বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সঞ্চালন ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আরও প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত রয়েছে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, ভূগর্ভে গ্যাস থাকলেও সেটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা না থাকলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা স্পষ্ট। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সাময়িকভাবে ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে দেশীয় উৎসের গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বর্তমানে অব্যবহৃত গ্যাস দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।

ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সঞ্চালন ব্যবস্থা। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন প্রকল্পের বিস্তারিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।

এর পাশাপাশি ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। এই অবকাঠামো তৈরি হলে ভোলার গ্যাস দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

খুলনা পর্যন্ত গ্যাস পৌঁছানো গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও সময় প্রয়োজন হবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে গ্যাসের মজুত, উৎপাদন সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভোলার গ্যাস ব্যবহারের জন্য জাতীয় গ্রিডে নেওয়াই একমাত্র পথ নয়। স্থানীয়ভাবে গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, গ্যাসভিত্তিক শিল্প, শিল্পপার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে।

পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে গ্যাসের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ, নদীবন্দর, বিদ্যুৎ, পানি, আবাসন এবং দক্ষ জনশক্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ভোলার মেসার্স খান ফ্লাওয়ার মিলসের স্বত্বাধিকারী ও ভোলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন খান বলেন, নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ভোলায় শিল্প স্থাপনে আগ্রহ বাড়বে। তবে বড় শিল্পায়নের জন্য গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, সড়ক, নদীবন্দর ও অন্যান্য শিল্প অবকাঠামোরও উন্নয়ন প্রয়োজন।

ভোলায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে। বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা নর্থ-১, ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১ কূপ থেকে অতিরিক্ত ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের জন্য প্রসেস প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ভোলায় আরও পাঁচটি নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কূপে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।

বাপেক্স ও রাশিয়ার গ্যাসপ্রমের অনুসন্ধানেও ভোলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে চরফ্যাশনসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন অনুসন্ধান চালানো হলে ভবিষ্যতে গ্যাসসম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টিও সরাসরি সম্পর্কিত। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদন করা সম্ভব হয় না।

ভোলার গ্যাস স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাসের ব্যবহার, মালয়েশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নিতে ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এবং বাপেক্সের ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলার গ্যাস নিয়ে বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগের আগে প্রকৃত উত্তোলনযোগ্য মজুত নির্ধারণ করা জরুরি। কোনো গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত এবং বাস্তবে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব এমন গ্যাসের পরিমাণ এক নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমামের মতে, গ্যাসের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। কোথায় ব্যবহার করলে গ্যাস থেকে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য পাওয়া যাবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, শিল্পকারখানা কিংবা জাতীয় গ্রিড কোন ক্ষেত্রে গ্যাস ব্যবহার করলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে, তা ব্যয় ও সম্ভাব্য লাভের তুলনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন কূপ খনন, উৎপাদন পরীক্ষা এবং সময়ের সঙ্গে কূপের চাপ ও উৎপাদন সক্ষমতা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মজুতের বাস্তব চিত্র বের করা জরুরি।

ভোলার গ্যাসের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি বিষয়ে প্রায় অভিন্ন মত রয়েছে শুধু গ্যাস উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদন থেকে ব্যবহার পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে।

জাতীয় গ্রিডে কতটা গ্যাস যাবে, স্থানীয় শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে কতটা ব্যবহার হবে, ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়লে তার জন্য কতটা সঞ্চালন সক্ষমতা প্রয়োজন হবে এসব বিষয়কে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।

একই সঙ্গে ভোলার উপকূলীয় পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। গ্যাস অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টিও পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা বাড়ছে এবং এলএনজি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে এমন বাস্তবতায় ভোলার গ্যাস বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের অপেক্ষায় না থেকে বর্তমানে অব্যবহৃত গ্যাস দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করতে পারলে দেশের জ্বালানি সরবরাহে বাড়তি সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

তবে সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে অনুসন্ধানের ফল, উৎপাদন সক্ষমতা, সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ এবং গ্যাস ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনার ওপর। ভোলার গ্যাসকে আঞ্চলিক সম্পদ থেকে জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার কার্যকর অংশে পরিণত করতে তাই উৎপাদন, সঞ্চালন ও শিল্পায়ন তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন