- ০৪ অক্টোবর, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
তীব্র গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলের গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত, আবার কোনো কোনো কারখানায় টানা কয়েক দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। এতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।
কারখানা সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা জনবল কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন শিল্পমালিক ও কর্মকর্তা।
আশুলিয়ার কাঠগড়া আমতলা এলাকায় ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এ আর ও ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেডে কয়েক সপ্তাহ ধরে কম সক্ষমতায় উৎপাদন চলার পর বুধবার রাতে কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার কারখানাটিতে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি সেকশনের কোনোটিতেই উৎপাদন চলছে না। শ্রমিকদেরও কারখানায় দেখা যায়নি; নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার পর তাদের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একপর্যায়ে স্বাভাবিক সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ উৎপাদন কমে যায়। দৈনিক ৫০ হাজার পিস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বাইরে থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
কারখানাটির ড্রাই প্রসেস, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কোয়ালিটি সেকশনে প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি মেশিন রয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় এর মধ্যে ২৪টি মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার কারখানার গ্যাস মিটারে চাপ পাওয়া যায় মাত্র ২ দশমিক ৫ পিএসআই।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে অন্তত ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। অথচ সেখানে চাপ কখনো শূন্যে নেমে যাচ্ছে, আবার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠছে। এর সঙ্গে গ্যাসের মানও সবসময় ব্যবহার উপযোগী থাকছে না।
ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কোম্পানি সচিব আরএকে লিটন বলেন, ওয়াশিং প্ল্যান্টে উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বাইরে থেকে গ্যাস এনে সিএনজি স্টেশনের মতো ব্যবস্থায় উৎপাদন চালুর চেষ্টা করা হলেও তাতে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বরং প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। দিনের প্রায় অর্ধেক সময় গ্যাসের চাপ শূন্য থাকছে বলেও জানান তিনি।
আশুলিয়ার আরেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পাকিজা গ্রুপও একই সংকটে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের অভাবে তাদের টেক্সটাইল কারখানা টানা ১৫ দিন ধরে বন্ধ। এতে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তাকর্মীরাও জানান, বর্তমানে সেখানে কোনো শ্রমিক কাজ করছেন না।
এদিকে রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ডাইং ইউনিট কাগজে-কলমে চালু থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন প্রায় বন্ধ বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ পিয়াল। তাঁর দাবি, গ্যাসের চাপ না থাকায় শ্রমিকরা কর্মস্থলে বসে থাকছেন এবং প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অনিরুদ্ধ পিয়াল বলেন, সামান্য গ্যাসের চাপ পেলেই মেশিন চালু করা হয়। কিন্তু মেশিন গরম হওয়ার আগেই আবার গ্যাস চলে যায়। ফলে প্রতিটি ব্যাচে থাকা বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
রিং শাইন টেক্সটাইলের প্রায় ৯৭৫ শ্রমিকের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, গ্যাস দিয়ে বর্তমানে কোনো উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুতের মাধ্যমে প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদন চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যবহার করে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।
বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করায় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানান তিনি। প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ টাকা ব্যয় হচ্ছে। গ্যাসের চাপ সর্বোচ্চ ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠলেও তা জেনারেটর চালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।
বর্তমানে ছয়টি সেকশনের মধ্যে মাত্র দুটি চালু রেখে তিন শিফটে উৎপাদন রেশনিং করা হচ্ছে। খোরশেদ আলমের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
তবে শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের কারণে বড় ধরনের কারখানা বন্ধের তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। শিল্প পুলিশ-১-এর সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আশুলিয়া অঞ্চলে কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে নেই।
তিনি জানান, মুন্নু সিরামিকস এক-দুই দিন বন্ধ ছিল। এ ছাড়া প্রীতি অ্যাপারেলসসহ আরও একটি কারখানা একই সময়ে সমস্যায় পড়েছিল। তবে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হলে এসব কারখানায় আবার উৎপাদন শুরু হয়।
শিল্প মালিকদের বক্তব্য ও শিল্প পুলিশের তথ্যে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও আশুলিয়ার কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ নিয়ে ভোগান্তির বিষয়টি স্পষ্ট। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।