- ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
দেশীয় স্পিনিং শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির সুযোগ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে কাঁচামাল হিসেবে সুতা আমদানিতে করের বোঝা বেড়ে প্রায় ৩৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) একটি চিঠির মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার অনুরোধ জানায়। যদিও ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি, তবু প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে দেশের টেক্সটাইল মিল মালিক ও তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীদের সংগঠনগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্ত শিল্পটির জন্য ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে সুতার চাহিদা কমে যাওয়ায় অন্তত ১০০টি স্পিনিং মিল আংশিক কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের টেক্সটাইল শিল্পে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। তাদের দাবি, ভারতীয় সুতার কম দামে আমদানির কারণে স্থানীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। ভারত সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়ায় সেখানকার রপ্তানিকারকরা বাংলাদেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে সুতা সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক মিল মালিক বলেন, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হলে দেশীয় উৎপাদিত সুতার চাহিদা বাড়বে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু হওয়ার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলো এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ মনে করছে, হঠাৎ করে শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধ হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিটওয়্যার উৎপাদনে ব্যবহৃত সুতার বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর। বর্তমানে ভারতীয় সুতা কেজিতে ২ দশমিক ৫৫ থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলারে পাওয়া গেলেও দেশীয় সুতার দাম ২ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৭৫ ডলার। প্রস্তাবিত বিধিনিষেধ কার্যকর হলে সুতার দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ২ দশমিক ৮০ থেকে ২ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পোশাক শিল্প নেতারা।
বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা ইতোমধ্যে কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দাম আদায় করা সম্ভব হবে না, ফলে রপ্তানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারের সুতা আমদানি করেছে, যার সিংহভাগই এসেছে ভারত থেকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, গত দুই বছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় উৎপাদন ও বিক্রির ওপর।
মন্ত্রণালয়ের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নিটওয়্যার শিল্প পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে পারে। এতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমে যাওয়া, লিড টাইম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে মাঠে নেমেছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে স্পিনিং মিল মালিকরা দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যকরের দাবি জানাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।