Monday, January 19, 2026

ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান: পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সরকার


ফাইল ছবিঃ পদ্মা নদী (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

দীর্ঘ ছয় দশকের আলোচনা, সমীক্ষা ও পরিকল্পনার পর অবশেষে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে প্রকল্পটির পুনর্গঠিত প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নের পথে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ সংক্রান্ত পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রস্তাবিত প্রকল্পটির সার্বিক দিক তুলে ধরে।

পাউবো সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। তবে ব্যয় ও বাস্তবায়ন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে পিইসি এটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। প্রথম ধাপে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। এই পর্যায়ের কাজ ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাউবোর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে আগ্রহী হলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে চীনসহ অন্যান্য বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতে পারে।

বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টকে ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্থানে প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ ও নিম্নপ্রবাহে সুষম বণ্টন তুলনামূলকভাবে সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।

পদ্মা বা গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা প্রথম উঠে আসে ১৯৬০-এর দশকে। ১৯৬১ সালে তৎকালীন ইপওয়াডা (বর্তমান পাউবো) প্রথম সমীক্ষা শুরু করে। পরবর্তী চার দশকে একাধিক প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। ২০০২ সালে ওয়ারপো কুষ্টিয়া বা রাজবাড়ী অঞ্চলে ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। পরে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রস্তুত করা হয়।

এ সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল। ২০১৬ সালে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে সম্ভাব্য এলাকা পরিদর্শন এবং বৈঠকও করেন।

প্রস্তাবিত ব্যারাজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট ও ১৮টি আন্ডার স্লুইস। নৌযান চলাচলের জন্য একটি নেভিগেশন লক এবং মাছের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে দুটি ফিশ পাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেল সংযোগও স্থাপন করা হবে।

এ প্রকল্প থেকে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানির জোগান নিশ্চিত করা যাবে।

প্রথম ধাপে মূল ব্যারাজ নির্মাণের পাশাপাশি হিসনা-মাথাভাঙ্গা ও গড়াই-মধুমতী নদী ব্যবস্থার পুনঃখনন করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত অবকাঠামো এবং অন্যান্য নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে কৃষি, মৎস্য, নৌচলাচল ও বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাদুপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।

পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী ও চন্দনা-বারাশিয়া নদী ব্যবস্থায় ব্যাপক পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পাউবো কর্মকর্তারা আশা করছেন, বর্ষা মৌসুমে পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি বিভিন্ন নদী ব্যবস্থায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে লবণাক্ততা হ্রাস, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষা পাবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বলেন, এই প্রকল্পটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল। সঠিক নকশা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও লবণাক্ততা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এত বড় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর গতিপ্রকৃতি ও পরিবেশগত প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি। যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকির তুলনায় প্রকল্পের সুফলই বেশি হবে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন