- ০৮ আগস্ট, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। গত দুই বছরে তাদের কেউ ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমালেও একটি বড় অংশ এখনো পশ্চিমবঙ্গেই অবস্থান করছেন। পরিচয় ও অবস্থান গোপন রেখে কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অনেকটা আড়ালেই দিন কাটাচ্ছেন তারা।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ৭০ নেতা অবস্থান করছেন। তাদের বেশির ভাগই কলকাতা ও এর আশপাশের এলাকায় থাকছেন। পাশাপাশি পুলিশের প্রায় ৪০ কর্মকর্তাও সেখানে অবস্থান করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, পুলিশ এবং সেনা কর্মকর্তাসহ প্রায় ২০০ জন কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করলেও সময়ের সঙ্গে এ সংখ্যা কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, দেশ ছাড়ার পর তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের আর্থিক সহায়তায় দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশে থাকার সময়ের তুলনায় তাদের অনেকের আর্থিক সামর্থ্যও কমে গেছে।
কারও থাকার ব্যবস্থা হয়েছে ভাড়া বাসায়, কেউ আবার কয়েকজন মিলে একটি বাসা ভাড়া করে থাকছেন। অনেকের পরিবারও তাদের সঙ্গে নেই। ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে ট্যাক্সি কিংবা গণপরিবহণ ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে কয়েকজন জানিয়েছেন।
দেশ ছাড়ার পর প্রথম দিকে পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল বলে জানান কেউ কেউ। নিরাপত্তার কারণে এক জায়গায় বেশি দিন না থেকে আত্মীয়স্বজনের বাসায় অবস্থান করেছেন তারা। মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ জানান, বাংলাদেশ ছাড়ার পর কয়েক মাস তিনি বিভিন্ন আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সময় নিজের ফোন ব্যবহার না করে আত্মীয়দের ফোন ব্যবহার করতেন।
ভারতে অবস্থান করেও আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হননি বলে জানিয়েছেন। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে থাকা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন, চলমান মামলায় সহায়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
কলকাতা ও আশপাশে থাকা নেতারাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। একসময় কলকাতার কাছাকাছি একটি বাণিজ্যিক অফিস ভাড়া নিয়ে কয়েকজন নেতা নিয়মিত সেখানে বৈঠক করতেন বলে আওয়ামী লীগের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। ওই জায়গাটি দলীয় কার্যালয়ের মতো ব্যবহার করা হলেও পরে সেটি আর ব্যবহার করা হয়নি।
গত দুই বছরে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগাযোগ হয়েছে বলেও জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে সরাসরি সাক্ষাতের ঘটনা খুব বেশি না থাকলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছোট ছোট দলে দিল্লি গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন।
এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় তিনি বাংলাদেশেই আত্মগোপনে ছিলেন। নিরাপত্তার কারণে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে তাকে। সেই অবস্থার মধ্যেও সংগঠনের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
পরে পরিস্থিতির কারণে দেশ ছাড়লেও আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে দাবি সাদ্দামের।
অভিনেত্রী ও আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত রোকেয়া প্রাচীও ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে আত্মগোপনে থাকার কথা জানিয়েছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর দেশে অবস্থানকালে নিজের পরিচয় ও অবস্থান গোপন রাখতে অন্তত ১২টি সিম পরিবর্তন করেছিলেন তিনি। প্রথম কয়েক দিন বাসায় অবস্থান করার পর একসময় ভোরে গোপনে বেরিয়ে যান। পরিচয় আড়াল করতে বোরকা পরেও বাইরে বের হতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
নিজের ফোন বন্ধ করে দেওয়ার পর আর সেটি ব্যবহার করেননি বলেও জানান রোকেয়া প্রাচী। বিভিন্ন বাসায় অবস্থান করার সময় সেখানকার মানুষের ফোন ব্যবহার করে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন বলে জানান তিনি।
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এখন দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার এমন বক্তব্যের পর দলের কয়েকজন নেতাও দেশে ফিরে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতির কথা বলেছেন।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি দলীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সেখানে প্রতিবেদন পাঠানোর মতো কাজ করেছেন।
সাদ্দাম হোসেনও দেশে ফেরার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীরাই দলের মূল শক্তি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, কমিটি পুনর্গঠন, মামলা সংক্রান্ত সহায়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার কাজ করেই সময় কাটছে।
তিনি জানান, মানসিক ও পারিবারিকভাবে তারা দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত। তবে ফেরার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।
অন্যদিকে শেখ হাসিনাও দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি কবে এবং কীভাবে দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি।